জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বন্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এক নতুন মোড় নিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে এবং একটি টেকসই চুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বর্তমানে তেহরানে অবস্থান করছেন। তিনি মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ বার্তা ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এবং দ্বিতীয় দফা আলোচনার উপযুক্ত সময় ও কাঠামো নির্ধারণে কাজ করছেন।
এদিকে, গত বুধবার হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অত্যন্ত আশাবাদী। পরবর্তী দফার এই উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা খুব শিগগিরই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর : আল-জাজিরা ও বিবিসির।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি ঐতিহাসিক ঘটনার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ৩৪ বছর পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ নেতারা আজ (গতকাল) সরাসরি কথা বলবেন। ফলে লেবানন ফ্রন্টে ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি মন্ত্রিসভাও গত বুধবার লেবাননে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসে। লেবাননি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, শিগগিরই এই ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কথাবার্তা চলমান আছে এবং তা বেশ আশাব্যঞ্জক। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, পরবর্তী দফার বৈঠকও ইসলামাবাদেই হতে পারে। যেখানে প্রথমবার মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। যদিও দুই সপ্তাহের চলমান যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধের খবর হোয়াইট হাউজ অস্বীকার করেছে, তবে তারা একটি স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে ইতিবাচক।
অন্যদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ নিয়ে উত্তেজনা এখনও তুঙ্গে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, গত সোমবার থেকে তারা ১০টি জাহাজকে ফেরত পাঠিয়েছে এবং কোনো জাহাজ অবরোধ ভাঙতে পারেনি। তবে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের সুপার ট্যাংকার ‘আরএইচএন’ ও ‘রিচ স্টারি’ অবরোধ উপেক্ষা করেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ইরানের সামরিক উপদেষ্টা মোহসিন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালিতে ‘পুলিশ’ হওয়ার চেষ্টা করে তবে তাদের জাহাজগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ডুবিয়ে দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ থাকলেও দেশটি অভ্যন্তরীণ সক্ষমতায় আরও দুই মাস তেল রপ্তানি ছাড়াই টিকে থাকতে পারবে। এফজিই নেক্সট্যান্টইসিএর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের স্থল ও নৌ-সংরক্ষণাগারগুলোতে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল রাখার সক্ষমতা রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বন্ধ করার প্রয়োজন হবে না তেহরানের। তবে এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে দৈনিক ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে যা আকাশচুম্বী করে তুলবে জ্বালানির দাম।
চীনও এই পরিস্থিতিতে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি যুদ্ধ ও শান্তির এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।’ একই সময়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করা হয়েছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কঠোর সমালোচনা করে তাদের ‘প্রকৃত সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তা সত্ত্বেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তার দেশ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামাবাদে আগামী শনিবার ফের আলোচনায় বসার সম্ভাবনা নিয়ে এখন পাকিস্তানের দিকে বিশ্ব কূটনীতির নজর।


