অবিক্রীত ১৫ লাখ টন পাথর  নিয়ে বিপাকে মধ্যপাড়া

শেখ সাদী খান, ঢাকা: সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা, বিভিন্ন প্রজেক্টে এলওসি চুক্তির অধীনে ভারত থেকে পাথর আমদানি এবং মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ক্রয় হ্রাসের ফলশ্রুতিতে খনির ২৫টি স্ট্যাক ইয়ার্ডে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। জানা যায়, মধ্যপাড়ার প্রধানতম ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে হলেও এই সংস্থাটি রেলপথ ও ভবন নির্মাণে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করে না। এ ছাড়া দেশের নদী শাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে মধ্যপাড়ার পাথরও সেভাবে ব্যবহৃত হয় না।

জানা যায়, বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে আমদানিকৃত ভুটানের তোষা পাথরের মূল্যের চেয়ে খনি থেকে উৎপাদিত পাথরের দাম ৭৪৫ দশমিক ৫০ টাকা বেশি। এ ছাড়া আমদানিকৃত ইন্ডিয়ান পাথরের মূল্যের বিবেচনায় বর্তমানে খনি থেকে উৎপাদিত পাথরের গড় মূল্য ১০৫০ দশমিক ৫০ টাকা বেশি হওয়ার কারণে মধ্যপাড়া পাথর ক্রয়ে ভোক্তাদের চাহিদা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি মূল্যের থেকে বাইরে মূল্য অনেক বেশি এবং খনি কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণ, সরকারের সদিচ্ছার অভাব, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের গাফিলতিতে খনিটি ধীরে ধীরে রুগ্নশিল্পে পরিণত হয়েছে। মধ্যপাড়ার প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে হলেও স্বয়ং এই সংস্থাটি রেলপথ ও ভবন নির্মাণে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করে না। এ ছাড়া দেশের নদী শাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে মধ্যপাড়ার পাথর সেভাবে ব্যবহৃত হয় না।

মধ্যপাড়া খনি থেকে যে হারে পাথর উৎপন্ন হচ্ছে সেই হারে বিক্রি না হওয়ায় খনির স্ট্যাক ইয়ার্ডে পাথর মজুদের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। পাথর উৎপাদন ও বিক্রয়ের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে পর্যাপ্ত স্ট্যাক ইয়ার্ডের অভাবে খনির উৎপাদন কার্যক্রম আনুমানিক এক মাস অব্যাহত রাখা যাবে বলে জানিয়েছেন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডি এম জোবায়েদ হোসেন।

কোম্পানির একাধিক কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, মধ্যপাড়া খনির ৫১ শতাংশ উৎপাদিত পাথরের প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পাউবো হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে, নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ, নদী শাসনের কাজে ভারত ও ভুটান থেকে আমদানি করা পাথর ব্যবহার করা হয়। এমজিএমসিএলের একাধিক কর্মকর্তা আরও বলেন, নোয়াখালী জেলা কৃষক লীগ নেতা কাজী সিরাজুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) সঙ্গে চুক্তির পর থেকে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

বাজার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাজার চাহিদা অনুযায়ী পাথরের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কারণে পাথর বিপণন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় পাথর বিক্রি না হওয়ায় একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অপরদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে পাথর আমদানি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খনিটি ধীরে ধীরে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হবে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডি এম জোবায়েদ হোসেন।

এমজিএমসিএল সূত্রে জানা যায়, খনি থেকে উত্তোলিত মোট উৎপাদনের প্রায় ৩৪ শতাংশ হলো ৪০ থেকে ৬০ মি.মি. সাইজের ব্যালাস্ট, যার একমাত্র গ্রাহক বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলওয়ের বিভিন্ন প্রজেক্টগুলোতে পাথর ক্রয়ে সীমাবদ্ধতা, বাজেট বরাদ্দ না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ৮ দশমিক ৬৭ লাখ মেট্রিক টন পাথর অবিক্রীত রয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকায় নতুন করে উত্তোলিত পাথর রাখার জায়গা নেই। এ অবস্থায় বিক্রি করতে না পারায় খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। খনিটি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমজিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, খনি থেকে উত্তোলিত মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ হলো বোল্ডার সাইজের (২৫০ মিমি) পাথর, যা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এর নদী শাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ৩ দশমিক ৭০ লাখ মেট্রিক টন বোল্ডার মজুদ থাকলেও বাপাউবো আশানুরূপ পাথর ব্যবহার করছে না। এ ছাড়া সড়কপথে পাথর পরিবহন খরচ বেশি। মধ্যপাড়া থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত মাত্র ১৩ কিলোমিটার রেললাইন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকায় সাশ্রয়ী মূল্যে সারা দেশে পাথর সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতকে বলেন, প্রথমত সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পাউবো এগুলো হচ্ছে মূল গ্রাহক। কিন্তু তারা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের পাথর নিচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, সরকারি মূল্য বাইরের মূল্য থেকে অনেক বেশি। এজন্য বিক্রিও করা যাচ্ছে না।

এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম জাতীয় অর্থনীতকে বলেন, প্রথমত, আমদানিকৃত পাথরের মূল্য কত এবং মধ্যপাড়া পাথর বিক্রির মূল্য কত টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, এটা প্রথমে যাচাই করতে হবে। এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য কত টাকা সেটা বিশ্লেষণ করা জরুরি।

তিনি বলেন, দেশে ব্যাপক পাথরের চাহিদা আছে। ভোক্তা যখন পাথর কিনবে তখন আমদানিকৃত পাথরের দাম ও দেশি পাথরের দামের মধ্যে সামঞ্জস্য হতে হবে। তা না হলে দেশি পাথরের চাহিদা থাকবে না। সুতরাং মধ্যপাড়া পাথরের ক্ষেত্রেও সেটাই। ভোক্তা সাধারণের দামে পোষালে কিনবে নইলে কিনবে না।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, মধ্যপাড়া খনির পাথরের দাম বাড়িয়ে রেখে আমদানিকারকদের ব্যবসা যদি রমরমা করে খনি কর্তৃপক্ষ তাহলে পাথর কেউ কিনবে না এবং খনি কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যক্তিগত লাভের কারণে দেশের এই ক্ষতি করছে কি না এটাও ভাবনার বিষয়।

এমজিএমসিএল সূত্রে জানা যায়, কৃষক লীগ নেতা কাজী সিরাজের মাইন ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) সঙ্গে বৈদেশিক ও স্থানীয় মুদ্রায় ১৭১ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পাথর উত্তোলনের চুক্তি হয়। তারা ৬ বছরে ৯২ লাখ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন এবং সরকারের ৬৮ কোটি টাকা অগ্রিম নিয়ে তারা কাজ শুরু করে। চুক্তির মেয়াদে ১২টি স্টোপ উন্নয়ন করে ৯২ লাখ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের কথা থাকলেও ছয় বছরে জিটিসি মাত্র ছয়টি স্টোপ উন্নয়ন করে ৩৭ দশমিক ৫৬ লাখ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদন করে।

এদিকে এমজিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডি এম জোবায়েদ হোসেন মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করে বলেন, জিটিসি’র সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের সময়ে ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলার ৮৫ টাকা, যা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে। যেহেতু চুক্তিমূল্যের প্রায় ৭৯ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় (মার্কিন ডলার) পরিশোধযোগ্য, তাই ডলার বিনিময় হার প্রায় ৪৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে।

একাধিক কর্মকর্তা জানান, দেশের সব প্রান্তে সাশ্রয়ীমূল্যে সারা দেশে পাথর সরবরাহ করার জন্য মধ্যপাড়া থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত অকেজো ১৩ কিলোমিটার রেললাইন সংস্কার করে সারা দেশে পাথর সরবরাহের উপযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আলোর মুখ দেখবে খনিটি।