উদ্বোধনের তিন বছরেও  অসম্পূর্ণ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এখনও অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে। তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ৯ বছর পার হতে চলেছে, তবুও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) না করায় প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা কবে নাগাদ শতভাগ কাজ শেষ হবে—সেটিও স্পষ্ট করে বলতে পারছে না। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছে।

২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আংশিক কাজ শেষ করে তড়িগড়ি করে উড়াল সড়কটির উদ্বোধন করেন। এরপর দুই বছর চার মাস কেটে গেলেও প্রকল্পটি এখনও পুরোপুরি চালু করা যায়নি।

মূলত চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত যানজট নিরসন ও দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ২০২০ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল।

প্রকল্পের শুরুতেই পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লালখান বাজার থেকে এক্সপ্রেসওয়ে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি; বরং জিইসি মোড় থেকে কার্যক্রম শুরু করা হয়। তবে মামলা জটিলতা ও জায়গা সংকটের কারণে ওই অংশের র‌্যাম্প নির্মাণও বন্ধ রয়েছে। একইভাবে আগ্রাবাদ, ফকিরহাট, টাইগারপাস, কেইপিজেড ও সিইপিজেডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে র‌্যাম্প নির্মাণে জমি জট, ইউটিলিটি লাইন ও প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ বার বার থমকে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কেজিডিসিএল এবং অন্যান্য সংস্থার পাইপলাইন ও অবকাঠামো অপসারণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক স্থানে কাজ শুরুই করা যায়নি। কোথাও আবার পাইলিং শেষ হলেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পরবর্তী কাজ আটকে আছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি ব্যবহারের অনুমতি দেরিতে পাওয়া বা বুঝে না পাওয়াও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবায়নকারী সংস্থা অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে ঠিকভাবে সমন্বয় করতে পারেনি।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘‌কম ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়েছিল। বাস্তবে সেই সমীক্ষার সঙ্গে বর্তমান ব্যবহার ও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। মূলত সংশ্লিষ্টরা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ফিজিবিলিটি স্টাডি করিয়ে নিয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে।’

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বলছে, বন্দরের আপত্তি, রেলওয়ের আপত্তি, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, ট্রাফিক বিভাগের অনুমতি না পাওয়া, লালখান বাজার অংশের নকশা পরিবর্তন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এবং বিকল্প সড়ক চালুতে দেরিসহ নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে।

জানা যায়, ২০১৭ সালের আগস্টে একনেক সভায় অনুমোদিত ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়তে বাড়তে এখন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। মেয়াদও দুই দফা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জানতে চাইলে সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে জিইসি, আগ্রাবাদ, ফকিরহাট, সিইপিজেড ও কেইপিজেড জংশনে র‌্যাম্প নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে টাইগারপাস জংশনে আমবাগানমুখী ডাউনওয়ার্ড র‌্যাম্প এবং নিমতলা এলাকার ডাউনওয়ার্ড ও আপওয়ার্ড র‌্যাম্পের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ফকিরহাট ডাউনওয়ার্ড র‌্যাম্প, সিইপিজেডের ডাউনওয়ার্ড ও আপওয়ার্ড র‌্যাম্পের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।’

তিনি জানান, আগ্রাবাদ ডেবারপাড় থেকে সী বিচমুখী আপওয়ার্ড র‌্যাম্প নির্মাণে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন ২১ দশমিক ৭৭ শতক জমি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন অনুমতি না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যায়নি। তবে সম্প্রতি রেলওয়ের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া গেছে এবং ভূমি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তিনামাও সম্পাদিত হয়েছে। শিগগিরই নির্ধারিত স্থানে থাকা ৬১টি দোকান উচ্ছেদ এবং পিডিবির বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তরের কাজ শুরু করা হবে। একইভাবে টাইগারপাস জংশনে আমবাগানমুখী ডাউনওয়ার্ড র‌্যাম্পের অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণেও বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭ দশমিক ৩৬ শতক জমি প্রয়োজন হলেও এখনও সেই জমি বুঝে পাওয়া যায়নি। যদিও এ বিষয়ে রেলওয়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তবে ভূমি হস্তান্তর বিলম্বিত হওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, জিইসি মোড়ে ওয়াসামুখী আপওয়ার্ড র‌্যাম্পের ১৭ নম্বর পিয়ার ছাড়া বাকি সব পিয়ারের কাজ শেষ হয়েছে। তবে ওই পিয়ারের স্থানে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন ও আরসিসি পিট থাকায় এবং মামলা জটিলতার কারণে র‌্যাম্পটির স্টার্টিং পয়েন্ট নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে। এ জন্য ওয়াসার চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হলেও এখনও আরসিসি পিট স্থানান্তরের কাজ সম্পন্ন হয়নি, ফলে র‌্যাম্পটির নির্মাণকাজ শুরু করা যাচ্ছে না। এছাড়া বাকি র‌্যাম্পগুলো কাজও চলমান রয়েছে। আশা করছি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

সব মিলিয়ে পরিকল্পনার ঘাটতি, সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে চট্টগ্রামের এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি এখন অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে। এতে সময়ের পাশাপাশি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।