লাখ কোটি টাকা ব্যয়েও  গতি আসেনি রেলে

শেখ সাদী খান, ঢাকা: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের আধুনিকায়নে একাধিক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে। গত দেড় যুগে রেল খাতে প্রায় লাখ কোটি টাকা ব্যয় হলেও ট্রেনের গতি, রানিং টাইম এবং সেবার মানে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। রেলসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নতুন ইঞ্জিন ও কোচ কেনা, নতুন রেলপথ নির্মাণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল ব্যয় করা হলেও বিদ্যমান ট্র্যাক সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।

গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে আধুনিক ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হলেও এর বড় অংশ বর্তমানে অচল বা আংশিক সচল অবস্থায় রয়েছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা ৩০০০ সিরিজের ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ১৪টি। বাকি ১৬টি বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটিতে ওয়ার্কশপে পড়ে আছে। একইভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা ৬৬০০ সিরিজের ৪০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ইতোমধ্যে পাঁচটি বিকল হয়ে গেছে। এ ছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ভারত থেকে আনা ৩০টি ইঞ্জিনের ৬টি চলাচলের অনুপযোগী।

রেল কর্মকর্তারা বলছেন, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং দুর্বল ট্র্যাকের কারণে নতুন ইঞ্জিনগুলোও দ্রুত কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। আর রেলের গতি না বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। দেশের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রুট এখনও সিঙ্গেল লাইনে পরিচালিত হওয়ায় ট্রেন চলাচলে বারবার অপেক্ষার প্রয়োজন হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি রেললাইনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২৫ কিলোমিটারই মিটার গেজ। এই পুরোনো গেজ ব্যবস্থায় উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনা কঠিন। এ ছাড়া ডুয়েল গেজ ব্যবস্থার কারণে এক গেজ থেকে অন্য গেজে স্থানান্তরে জটিলতা সৃষ্টি হয়, যা রানিং টাইম কমানোর পথে বড় প্রতিবন্ধকতা।

অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন ও পুরোনো লাইনের কারণে গতি কমেছে। ৬০ শতাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৫০ বছরের পুরোনো লাইন ও স্লিপারের কারণে ইঞ্জিনগুলোকে ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে হচ্ছে। তবে বিছু আন্তঃনগর ট্রেন (যেমন : সোনার বাংলা, বনলতা) ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে। তবে নতুন ব্রড গেজ লাইনে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার সক্ষমতা আছে। বিপুল বিনিয়োগ ও নতুন কোচ আনা হলেও পুরোনো অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ট্রেনের গতি বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। যেমন- ২০০৯ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রার সময় নির্ধারিত ছিল পাঁচ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট। এখনও প্রায় একই সময় লাগছে।

রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার ১০০টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই অবৈধ। এসব ক্রসিংয়ের অধিকাংশে নেই গেটম্যান বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং চালকদের অনেক ক্ষেত্রে গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত সময়ে রেল উন্নয়নে বড় অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ট্র্যাক সংস্কার, আধুনিক সিগন্যালিং এবং অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল, কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। ফলে সামগ্রিকভাবে রেলের সক্ষমতা বাড়েনি।

রেল খাতের বেশিরভাগ প্রকল্পেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। বরং বারবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮৮ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও অনেকগুলো এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বছর রেলের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৪৬টি নতুন এবং ৩৯টি সংশোধিত প্রকল্প গ্রহণ করে। রেলের উন্নয়নে ‘দৃশ্যমান’ অবকাঠামো বা বড় প্রকল্পে যতটা জোর দেওয়া হয়েছিল সেভাবে ‘গুণগত’ পরিবর্তন বা কারিগরি ব্যবস্থাপনায় যেমন : ট্র্যাক সংস্কার, সিগন্যালিং ও গেজ ইউনিফিকেশনে ততটা গুরুত্ব না দেওয়ায় রানিং টাইম বা গেজ ব্যবস্থা এখনও সেকেলে। আওয়ামী লীগ সরকারের মূল ফোকাস ছিল বড় বড় মেগা প্রজেক্ট বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণের দিকে। কিন্তু বিদ্যমান ট্র্যাক (লাইন) সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা করা হয়েছে। ফলে নতুন ইঞ্জিন এলেও পুরোনো ও জরাজীর্ণ লাইনের কারণে ট্রেনের গতি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। গত ১৫ বছরে রেল খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও রানিং টাইম (ভ্রমণ সময়), গেজ ব্যবস্থার সমন্বয় এবং সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এখনো ঢাকা-চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা-সৈয়দপুর যেতে রানিং টাইম একই আছে। সুতরাং উন্নয়ন ব্যক্তি পর্যায়ে ঘটেছে সামগ্রিকভাবে রেলের উন্নতি ঘটেনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, রেলে নতুন রুট নির্মাণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে, এমনটা বিশ্বব্যাংক থেকেও বলা হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের নামে রেলে যে লুটপাট-দুর্নীতি হয়েছে, তা চলমান রাখতে তৎকালীন মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নেননি। বরং প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দিকে হেঁটেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সবাই মিলেমিশে দুর্নীতি করেছে। তাই রেলে উন্নয়নের সুফলও নেই। ভয়াবহ দুর্নীতি আর অপরিকল্পিত প্রকল্পে রেলে অনিয়মের কঙ্কাল ভেসে উঠেছে। দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহিতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।’ একইসঙ্গে আগামীতে এমন অস্বাভাবিক ব্যয় ঠেকাতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। শামসুল হক বলেন, ‘এসব প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। কারণ সব দুর্নীতি ও অনিয়মের ভাগীদার তারাও।’

দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নতুন কোচ (বগি) কেনা হয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত শক্তিশালী ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) কেনা হয়নি। আবার কোচ ও ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আধুনিক ওয়ার্কশপ তৈরিতে পিছিয়ে থাকায় অল্প দিনেই দামি সরঞ্জামগুলো বিকল হয়ে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সচিব, ঠিকাদার এদের উন্নতি ঘটলেও রেলের অবকাঠামোগত কোনো উন্নতি হয়নি ।

আওয়ামী লীগ সরকার রেলের উন্নয়নে ২০১৩ সালে মহাপরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) তৈরি করে। এর বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১০ থেকে ২০৩০ সাল। এর আওতায় চার পর্বে ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। কিন্তু সময় মেনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় শুরুতেই হোঁচট খায় মহাপরিকল্পনা। ২০১৬ সালে মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে ছয় পর্বে ভাগ করা হয়। সব মিলে প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩০। সে সময় ব্যয় ধরা হয় সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজেদের পকেট ভারী করতে অত্যন্ত সুকৌশলে প্রতিটি প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ বাড়ানো হয়েছে একাধিকবার, যা ছিল চোখে পড়ার মতো। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীদের বিষয় নিয়ে সেভাবে আলোচনা না থাকায় অপরাধ করেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘দুদক ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ তদন্ত করছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে প্রকল্প গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’