নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের ব্যাংকখাতে ঋণ বণ্টনে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। মোট বিতরণকৃত ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশই কোটিপতিদের দখলে। বিপরীতে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন ২৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ঋণ। এতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত ছোট উদ্যোক্তারা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকখাতে মোট আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫ জনে। তাদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ২১ লাখ ৫৩৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা ঋণ। আর ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ আমানতকারীর জমাকৃত অর্থ ব্যবহার করছেন একজন ঋণগ্রহীতা। এই গড় চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের বৈষম্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, লাখ টাকার নিচের ঋণগ্রহীতাদের অংশ ২ শতাংশও নয়, যা নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ঋণগ্রহীতাদের প্রাধান্য বাড়তে থাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তারাই।
তাদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে ঋণ বণ্টনে ভারসাম্য আনা জরুরি। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, নজরদারি জোরদার এবং বড় ঋণের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিকল্প নেই।
প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, মুটে, মজুর, দোকানদারের বড় অঙ্কের ঋণ প্রয়োজন হয় না। তারা কখনও ৫০ হাজার, ১ লাখ বা ব্যবসাভেদে ৫ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। আর নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজন হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর বাইরে কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেন মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা। তারা বাড়ি এবং গাড়ির জন্য ঋণ নেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৮৬৬ গ্রাহক ব্যাংকখাতের মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশ দখলে নিয়েছেন। অথচ লাখ টাকার নিচের ঋণগ্রহীতারা ১ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তারা ঋণ নিয়েছেন মোট ২৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ১ থেকে ৫ লাখ টাকা নেওয়া গ্রাহকদের ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। তারা নিয়েছেন মোট ৭৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা ঋণ। আর নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজন হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
এসব গ্রাহক ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তাদের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এর বাইরে মধ্যম আয়ের চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী বা কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া গ্রাহকরা ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তাদের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংককে অবশ্যই সব খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো খাত যাতে অন্য খাতের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। যদি করে তবে অর্থনীতিতে মিসম্যাচ তৈরি হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর উচিত খাতকে গুরুত্ব দিয়ে ঋণ পোর্টফোলিও সাজানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। আশা করছি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঠিকমতো ঋণ পাবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশই দখলে নিয়েছেন ৪ হাজার ৮৬৬ গ্রাহক। ৫০ কোটি টাকার বেশি নেওয়া এসব ঋণগ্রহীতার মোট ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৬১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। ২০ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ হাজার ২৫৭। তাদের কাছে আছে ৮ লাখ ২২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা ব্যাংকখাতের মাধ্যমে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এমন গ্রাহকের সংখ্যা ৪৬ হাজার ২৪৭। তাদের কাছে বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ রয়েছে তাদের কাছে। ১ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৯। তাদের হাতে রয়েছে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, অঙ্কে যা ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বরে ব্যাংকখাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪, যা সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতি বেড়েছে ৫ হাজার ৯৭৪ জন। ডিসেম্বরে কোটিপতিদের আমানত দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ।


