নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরাও (এমপি) ঋণখেলাপির তালিকায় আছেন। বর্তমান সংসদের এমপি এবং তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনটি পরিচালিত হয়। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সংসদ সদস্য এবং তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো থেকে নেওয়া মোট ঋণের স্থিতি ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এই ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, উল্লিখিত ঋণের মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি। তবে তিনি বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে উল্লেখ করেন, আদালতের নির্দেশনা বা স্থগিতাদেশের কারণে এই খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হতে পারে, যা আইনি মারপ্যাঁচে খেলাপি তালিকার বাইরে ছিল।
বর্তমান সংসদের এমপিদের মধ্যে সিলেট-১ আসনের খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও তার স্ত্রীর ব্যাংকঋণ রয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে আবদুল মুক্তাদিরের ঋণ ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তার স্ত্রীর নামে ঋণ ট্রাস্ট ব্যাংকে ৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকে ৯৮ লাখ টাকা ঋণ আছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঋণ আছে তাদের। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামে ৬৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। তাকে ঋণখেলাপি দেখানোর ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (নির্বাচনের পর ১১ দিন)।
বগুড়া-১ আসনের এমপি কাজী রফিকুল ইসলামকে ঋণখেলাপি দেখানোর ওপর স্থগিতাদেশের একটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৫ জানুয়ারি। অপর একটির স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৭ মার্চ। আরেকটির স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ এপ্রিল।
বেসরকারি দুটি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় কাজী রফিকুল ইসলাম অন্তত ৭৬৫ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হন। এজন্য শুরুতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন তিনি। পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে সুযোগ পান।
কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জমজম কার অ্যান্ড অটোমোবাইল। এর মালিক ও জামিনদাতা হিসেবে তিনি ঋণখেলাপি। আবার জমজম ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড নামের আরেকটির পরিচালক হিসেবেও ঋণখেলাপি তিনি। দুটি প্রতিষ্ঠানই ব্যাংক এশিয়া থেকে ঋণ নিয়েছিল।
বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৫ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। হলফনামায় তিনি নিজের নামে মাত্র ২৭ লাখ টাকা এবং স্ত্রী শাহনাজ সিরাজের নামে ৪ লাখ টাকা ঋণের কথা উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী, তার সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ঋণ।
এর মধ্যে ক্যাব এক্সপ্রেস বিডির নামে ২৬ কোটি টাকা, ওয়ানটেল কমিউনিকেশনের নামে ৪৮ কোটি টাকা এবং এসআর হাইওয়ে সার্ভিসেসের নামে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটির চেয়ারম্যান এবং একটির পরিচালক।
ময়মনসিংহ-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন। হলফনামা অনুযায়ী তিনি এবং তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে দুটি বেসরকারি ব্যাংকে প্রায় ৯৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। এর মধ্যে এনআরবি ব্যাংকে ৩২ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকে ৬৫ কোটি টাকা। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের আগেই আগামী ৬ জুন পর্যন্ত তাকে ঋণখেলাপি না দেখাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন আদালত।
সীতাকুণ্ড ও পাহাড়তলী নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে জয়ী আসলাম চৌধুরী জামিনদার হিসেবে ও পরিচালক হিসেবে পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিজের ও অন্যান্য মিলে তার ঋণ রয়েছে ৩৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। জামিনদার হিসেবে তার ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে ঋণ ২৮৫ কোটি টাকা। সিআইবিতে তার ঋণখেলাপি না দেখানোর ওপর প্রথমে গত ১৯ ও ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি নির্বাচনের আগেই আবার আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পান।
চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি সরোয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন কোম্পানি এনএফজেড টেরি টেক্সটাইলের নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেওয়া ২০১ কোটি টাকার ঋণ এখন খেলাপির খাতায় রয়েছে।


