প্রযুক্তি ডেস্ক: ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল কুইক কমার্স বা দ্রুততম সময়ে পণ্য সরবরাহ খাতে এক বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। কয়েক বছর ধরে জেপ্টো, ব্লিনকিট এবং সুইগি ইন্সটামার্টের মতো স্থানীয় স্টার্টআপগুলো এই বাজারে আধিপত্য করলেও এখন তাদের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে দুই জায়ান্ট—ফ্লিপকার্ট এবং আমাজন। টেকক্রাঞ্চের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বড় কোম্পানিগুলোর বিশাল পুঁজি এবং উন্নত লজিস্টিক সক্ষমতার চাপে রীতিমতো ‘পিষ্ট’ হচ্ছে ছোট ও মাঝারি কুইক কমার্স স্টার্টআপগুলো।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ফ্লিপকার্ট এবং আমাজন ভারতের বিভিন্ন শহরে তাদের নিজস্ব দ্রুত ডেলিভারি সেবা ‘মিনিটস’ এবং দ্রুততর সংস্করণগুলো চালু করেছে। যেখানে স্টার্টআপগুলো ১০-১৫ মিনিটে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, সেখানে ফ্লিপকার্ট এবং আমাজন এখন কেবল মুদি পণ্যই নয়, বরং স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং ছোটখাটো ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীও আধা ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারি দিচ্ছে। বিশাল ডিসকাউন্ট এবং অফারের মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে, যা স্টার্টআপগুলোর জন্য মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লিপকার্ট তাদের দেশজুড়ে বিস্তৃত শক্তিশালী লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং ‘ডার্ক স্টোর’ (পণ্য মজুদের ছোট কেন্দ্র) বাড়ানোর পেছনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। আমাজনও পিছিয়ে নেই; তারা তাদের প্রাইম মেম্বারদের জন্য কুইক কমার্স সেবাটি আরও সহজলভ্য করেছে। অন্যদিকে, জেপ্টো বা ব্লিনকিটের মতো কোম্পানিগুলো মূলত সীমিত মূলধনের ওপর নির্ভর করে। বড় কোম্পানিগুলো যখন বড় অঙ্কের লোকসান সহ্য করেও বাজার দখলের চেষ্টা করছে, তখন ছোট স্টার্টআপগুলোর টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের কুইক কমার্স বাজার এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সবাই কেবল বাজার দখলের পেছনে ছুটছে, কিন্তু মুনাফা অর্জনের পথ এখনও অস্পষ্ট। জেপ্টোর মতো কোম্পানিগুলো নতুন করে বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করছে, কিন্তু আমাজন এবং ফ্লিপকার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর কাছে নগদের অভাব নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড়রা যখন এই খাতে প্রবেশ করে, তখন তারা মূলত ছোটদের ‘আউট-প্রাইস’ বা কম দামে পণ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করে।
এই তীব্র প্রতিযোগিতার ফলে সাধারণ গ্রাহকরা লাভবান হচ্ছেন। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক কম মূল্যে এবং দ্রুততম সময়ে ঘরের দরজায় সব ধরণের পণ্য পাচ্ছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ‘প্রাইস ওয়ার’ বা মূল্যের লড়াই ছোট কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারে। যদি শেষ পর্যন্ত কেবল দুই বা তিনটি বড় কোম্পানির হাতে পুরো কুইক কমার্স বাজার চলে যায়, তবে পরবর্তীকালে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সাল ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি পরীক্ষা। টেকক্রাঞ্চকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটি এখন আর কেবল ১০ মিনিটে সবজি পৌঁছে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি ডেটা এবং লজিস্টিক শক্তির লড়াই। ফ্লিপকার্ট এবং আমাজনের কাছে গ্রাহকের পছন্দ-অপছন্দের বিশাল ডেটাবেজ রয়েছে, যা তারা কুইক কমার্সে কাজে লাগাচ্ছে।’ছোট স্টার্টআপগুলোকে টিকে থাকতে হলে এখন হয়তো বড় কোনো কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হতে হবে অথবা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কোনো কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
ভারতের কুইক কমার্স খাতের এই ডামাডোল প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় কেবল উদ্ভাবন থাকলেই হয় না, বিশাল মূলধনের সমর্থনও প্রয়োজন। ফ্লিপকার্ট এবং আমাজনের এই সাঁড়াশি আক্রমণ ভারতের স্টার্টআপগুলোর জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। আগামী কয়েক মাসে এই খাতের অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা মালিকানা পরিবর্তন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভারতের এই দ্রুতগতির বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য সামনের দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন হতে চলেছে।


