আধুনিক জীবন মানুষকে এমন এক চাপে নিষ্পেষিত করে রাখছে, যার তীব্রতা ও ব্যাপকতা পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলো কখনও এভাবে অনুভব করেনি। চারদিক থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্দেহ এসে আছড়ে পড়ছে, পরস্পরবিরোধী মতাদর্শ এবং দর্শন মনকে টানাটানি করছে, আর দুনিয়ার লোভ-লালসা ও বিনোদন প্রতিনিয়ত ইচ্ছাশক্তিকে কব্জা করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
আজকের মানুষের অবস্থা নিয়ে যে কেউ গভীরভাবে ভাবলে দেখবে যে, মানসিক সংকট, বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি কিংবা আচরণগত বিশৃঙ্খলা বলে যা চিহ্নিত করা হচ্ছে, তার অধিকাংশের মূলে রয়েছে অসুস্থ অন্তর যার নেতিবাচক প্রভাব আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরে দেখতে পাচ্ছি। যে তরুণ এক বিশ্বাস থেকে আরেক বিশ্বাসে ভেসে বেড়ায় এবং কোথাও স্থির হতে পারে না, সে সন্দেহের রোগে আক্রান্ত।
আর যে ব্যক্তি কী করা উচিত তা ভালোভাবেই জানে, কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ করার সামর্থ্য নিজের মধ্যে খুঁজে পায় না, সে এমন প্রবৃত্তির রোগে ভুগছে যা তার ইচ্ছাশক্তিকে কুক্ষিগত করে নিয়েছে।
এই দুই রোগের প্রকৃত নিরাময় কেবল স্ব-সহায়তামূলক সাহিত্যের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়, আবার ঐশী পথনির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমেও নয়। এসব উপায় আংশিকভাবে উপকারী হলেও তাদের পরিধি সীমিত। প্রকৃত সত্য হলো, কোরআন কারিম হলো উভয় রোগের জন্য সমন্বিত নিরাময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য নিরাময় ও রহমত।' [সুরা আল-ইসরা (বনি ইসরাঈল): ৮২]
কোরআন সন্দেহের রোগ সারায় তার সুনিশ্চিত প্রমাণ ও দীপ্তিমান দলিলের মাধ্যমে, যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এমন সুস্পষ্ট পার্থক্য টেনে দেয় যে, যে হৃদয় তা প্রকৃতপক্ষে গ্রহণ করে তার কাছে আর কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ থাকে না। আর বিকৃত প্রবৃত্তির রোগ সারায় তার গভীর প্রজ্ঞা, সুন্দর উপদেশ এবং সেসব বর্ণনার মাধ্যমে যা গাফেলতির পরিণতি ও সুপথের ফল অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ফলে ইচ্ছাশক্তি সুস্থতায় ফিরে আসে এবং সৎ আমল স্বাভাবিকভাবেই অনুসরণ করে।
তবে এই নিরাময় একটি অপরিহার্য শর্তের সঙ্গে যুক্ত, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তা হলো- প্রকৃত তদব্বুর ও অনুধাবন, নিছক যান্ত্রিক তিলাওয়াত নয়। চিন্তা-চেতনাহীনভাবে পঠিত কোরআন সেই ওষুধের মতো, যা হাতে রাখা হয়েছে কিন্তু কখনও সেবন করা হয়নি। এখানেই সেই ব্যক্তির মধ্যে বিশাল পার্থক্য, যে কোরআনকে কেবল বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত একটি পাঠ্য হিসেবে দেখে এবং সেই ব্যক্তির মধ্যে, যে নিজেকে এবং তার চারপাশের জগতকে বোঝার ক্ষেত্রে কোরআনকে তার প্রথম ও প্রধান রেফারেন্স বানিয়ে নেয়।
তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তাদের মধ্যে কিছু নিরক্ষর আছে, যারা কিতাব সম্পর্কে কেবল (অন্ধ) ধারণা রাখে...' (সুরা আল-বাকারা: ৭৮)
আত্মার পরিশুদ্ধি কোনো বিলাসিতা নয়, যা কেবল প্রশান্ত আত্মার অধিকারীরা অবসর সময়ে চর্চা করে। এটি প্রতিটি সেই মানুষের অস্তিত্বগত প্রয়োজন, যে উদ্দেশ্য ও সচেতনতার সঙ্গে জীবনযাপন করতে চায়। আর এটি পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হতে পারে না, যতক্ষণ না কোরআনের গভীর তদব্বুর হৃদয়ের প্রতি সজাগ দৃষ্টির সঙ্গে মিলিত হয়। সন্দেহ ও প্রবৃত্তির রোগগুলো উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার চিকিৎসা করতে হবে, তা শিকড় গাড়ার এবং উপড়ে ফেলা কঠিন এমন স্থায়ী স্বভাবে পরিণত হওয়ার আগেই। কেননা হৃদয় সুস্থ হলে সবকিছু সুস্থ, আর হৃদয় বিকৃত হলে সবকিছু বিকৃত।
নবীজি (সা.) বলেছেন: 'জেনে রাখ, শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে; তা সুস্থ হলে পুরো শরীর সুস্থ থাকে, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, তা হলো হৃদয়।' (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)। তাই আমাদের উচিত প্রতিনিয়ত কোরআন অধ্যয়ন করে, রাসুলের সুন্নাহ অধ্যয়ন করে তার মর্ম উপলব্ধি করে আমাদের অন্তরকে সুস্থ রাখা। আমাদের সবার সুস্থ অন্তরই পারে আমাদের সুন্দর সমাজব্যবস্থা উপহার দিতে।
শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক


