বিশ্বজুড়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সিনেমা হল

বিনোদন ডেস্ক: দীর্ঘ কয়েক বছরের স্থবিরতা আর অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে রূপালি পর্দায় সুদিনের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন দর্শকদের পদচারণায় মুখর। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বসন্তকালীন মৌসুমে বক্স অফিসে দর্শকদের উপচেপড়া ভিড় হলমালিকদের মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। কয়েক বছরের মন্দা কাটিয়ে চলচ্চিত্র শিল্প কি তবে তার হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে? এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র।

সংকট কাটিয়ে নতুন পথচলা করোনা অতিমারি এবং পরবর্তীকালে হলিউডের চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতাদের ঐতিহাসিক ধর্মঘটের প্রভাবে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গন যে গভীর সংকটে পড়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছিল সবাই। সিনেমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেই ধাক্কা কাটিয়ে প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন স্বরূপে ফিরছে। তবে এবারের পরিবর্তনটা কেবল সিনেমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

আমেরিকার পেন সিনেমা চেইনের মালিক পেন কেচাম জানান, এখনকার প্রেক্ষাপটে কেবল ভালো সিনেমা দেখিয়ে দর্শকদের হলমুখী করা কঠিন। তিনি বলেন, ‘আমরা সিনেমাহলের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছি। প্রেক্ষাগৃহে এখন উন্নতমানের ক্যাফেটেরিয়া, ডাইনিং এবং আড্ডার জন্য বিশেষ লাউঞ্জ তৈরি করা হচ্ছে। দর্শক এখন শুধু সিনেমা দেখতে আসেন না, তারা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘অভিজ্ঞতা’ নিতে আসেন।’ এই কৌশলগত বিনিয়োগের ফলে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন প্রেক্ষাগৃহগুলোর আয় প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বক্স অফিসে সিনেমার মহোৎসব বাজার বিশ্লেষণী সংস্থা কমস্কোর-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর বড় পর্দায় সিনেমা মুক্তির সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ১১৩টি বড় বাজেটের এবং ব্যাপক আলোচিত সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। বছরের বাকি সময়ে বক্স অফিসে ঝড় তুলতে আসছে ক্রিস্টোফার নোলান-এর বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’। এ ছাড়া সায়েন্স ফিকশনপ্রেমীদের জন্য রয়েছে ‘ডুন : পার্ট থ্রি’, ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ এবং মার্ভেল ভক্তদের জন্য ‘স্পাইডারম্যান : ব্র্যান্ড নিউ ডে’।

ওটিটি বনাম প্রেক্ষাগৃহ : নতুন লড়াই প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে বিশ্বখ্যাত স্টুডিওগুলো। বিশেষ করে ইউনিভার্সাল পিকচার্স ঘোষণা করেছে, সিনেমা মুক্তির পর ওটিটি বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার আগে তারা প্রেক্ষাগৃহের জন্য অন্তত ৪৫ দিনের ‘উইন্ডো’ বা সময়সীমা বরাদ্দ রাখবে। অতিমারির সময় এই সময়সীমা কমিয়ে মাত্র ১৭ দিনে আনা হয়েছিল, যা হলের ব্যবসায় ধস নামিয়েছিল। স্টুডিওগুলোর এই নতুন সিদ্ধান্ত চলচ্চিত্র বাজারকে আবারও স্থিতিশীল করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তরুণ প্রজন্মের ‘ইউথকোয়েক’ আশার পাশাপাশি শঙ্কা যে নেই, তা নয়। বড় বড় স্টুডিওগুলোর একীভূত হওয়া এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে সিনেমাহল পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে। তবে সব শঙ্কা ছাপিয়ে আশার কথা শুনিয়েছে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’। ন্যাশভিলের ‘বেলকোর্ট থিয়েটার’-এর নির্বাহী পরিচালক স্টেফানি সিলভারম্যান তরুণদের এই জোয়ার সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন।

গত বছর চলচ্চিত্র নির্মাতা ডেভিড লিঞ্চ মারা যাওয়ার পর যখন তার থিয়েটারে লিঞ্চের সিনেমার রেট্রোস্পেক্টিভ দেখানও হয়েছিল, তখন তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন যে, টিকিট ক্রেতাদের অনেকের জন্মই হয়নি যখন ‘ব্লু ভেলভেট’ বা ‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’ মুক্তি পেয়েছিল। সিলভারম্যান বলেন, ‘সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল এবং দর্শকরা ৫০ বছর বয়সি ছিলেন না—তারা ছিল একদল তরুণ চলচ্চিত্রপ্রেমী। তারা স্ট্রিমিং এবং ইন্টারনেটের সঙ্গে বড় হয়েছে, যা তাদের সিনেমা সম্পর্কে আরও কৌতূহলী ও জ্ঞানপিপাসু করে তুলেছে।’

অদম্য পথচলা প্রেক্ষাগৃহ মালিক কেচামের কাছে নতুন প্রজন্মের এই জনপ্রিয়তা এক সংকেত যে, তার প্রেক্ষাগৃহ সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘টিভি যখন আবিষ্কার হয়েছিল তখন মানুষ বলেছিল সিনেমা শেষ, ভিডিও প্লেয়ার আসার সময় বা স্ট্রিমিং শুরু হওয়ার সময়ও তাই বলেছিল। প্রতিবারই তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে, কারণ আমরা এমন এক সম্মিলিত অভিজ্ঞতা দিই যা অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।’

এই ‘ শেয়ারড এক্সপেরিয়েন্স’ বা সম্মিলিত অনুভূতিকেই পুঁজি করে ২০২৬ সালকে বক্স অফিসের ঘুরে দাঁড়ানোর এক মাইলফলক বছর হিসেবে দেখছে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গন।