আনিসুর রহমান, ঢাকা: কারখানার একটি ইউনিট বন্ধ, অন্যটি আংশিক সচল; মৌলিক ভিত্তি দুর্বল, আয়ও ঋণাত্মক। তবুও এক বছরে প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে কোম্পানির শেয়ারের দর। বিপজ্জনক অবস্থায় থাকা এই কোম্পানির নাম ডোমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানির আর্থিক অবস্থার সঙ্গে শেয়ারদরের এই উল্লম্ফনের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বরং খুচরা বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত অংশগ্রহণ ও জল্পনাভিত্তিক লেনদেনের ফলেই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
মূলত উচ্চদরে এসব শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করা হয়েছে। এই কারসাজি চক্রের সঙ্গে ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও আরেক প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা আবুল খায়ের হিরু জড়িত বলে বাজারে গুঞ্জন আছে।
প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ডোমিনেজ স্টিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বি-ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত। এই কোম্পানি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) মাত্র ৯ পয়সা এবং লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা ১ শতাংশের নিচে। অথচ এক বছরে এর শেয়ারের দর বেড়েছে ৪১৫ শতাংশ। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ সালের এপ্রিল ডমিনেজ স্টিলের শেয়ারদর ছিল ১০ টাকা ৫০ পয়সা। ঠিক এক বছরের মাথায় গতকাল বুধবার সেটি ৫৪ টাকা ১০ পয়সায় লেনদেন হয়। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় পাঁচ গুণ দর বেড়েছে, যা দেশের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের মধ্যে অন্যতম।
তবে কোম্পানিটির আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসে। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক শূন্য দশমিক শূন্য ৯ টাকা, অর্থাৎ লোকসানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগের কয়েক বছরেও কোম্পানিটির আয় ছিল অত্যন্ত কম, এক টাকার নিচে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে চার পয়সা, ২০২৪ সালে তিন পয়সা এবং ২০২৫ সালে ছিল পাঁচ পয়সা।
এ অবস্থায় কোম্পানিটির প্রাইস-আর্নিং (পিই) রেশিও অর্থাৎ দর-আয় অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে রয়েছে হাজারের ঘরে, যা বাজারের স্বাভাবিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে ট্রেইলিং পিই ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে, যা বিনিয়োগ ঝুঁকির বড় ইঙ্গিত বহন করে। লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রেও কোম্পানিটির অবস্থান দুর্বল। সর্বশেষ বছরে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রায় অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ২০২০ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ডমিনেজ স্টিল কখনই উল্লেখযোগ্য লভ্যাংশ দিতে পারেনি।
এত নেতিবাচক পরিস্থিতির পরও গত বছরের জুলাই থেকে কোম্পানিটির শেয়ার দর তরতর করে বাড়ছে। ২০২৫ সালের ২ জুলাই শেয়ারটির দর ছিল ১০ টাকা ৫ পয়সা। সেটি ৩১ জুলাই সেটি বেড়ে ১৩ টাকা ৩০ পয়সায় উঠে। বাড়তে বাড়তে ৩১ আগস্ট ১৭ টাকা ৪ পয়সায় উঠে। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় তা চলতি বছর ৮ মার্চ এই শেয়ারের দর ৩৪ টাকা ৪০ পয়সায় উঠে। একমাসের মাথায় ১৬ টাকার বেশি বেড়ে ৯ এপ্রিল শেয়ারটির দর ৫০ টাকা ছাড়ায়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডোমিনেজের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো খুচরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও স্বল্প মূল্যের শেয়ার থেকে দ্রুত লাভের প্রত্যাশা। কোম্পানিটির শেয়ারের প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকায় জল্পনাভিত্তিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর পেছনে সংগঠিত কারসাজির আশঙ্কা রয়েছে। মৌলিক ভিত্তি বিবেচনা না করে শুধু দামের ঊর্ধ্বগতির ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সতর্ক করেন তারা।
অস্বাভাবিক এই দরবৃদ্ধির কারণে গত বছর সেপ্টেম্বরে ডিএসইর তলবের জবাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, শেয়ার দরের এই বৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। তখন এই শেয়ারের দরবৃদ্ধিকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে নভেম্বরে ডিএসইর পরিদর্শক দল সরেজমিনে গিয়ে ডমিনেজ স্টিলের নরসিংদীর কারখানা বন্ধ অবস্থায় পায়। তবে ঢাকার আশুলিয়ার কারখানাটি আংশিক চালু ছিল। অর্থাৎ উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত। তবু শেয়ার দরের এই অস্বাভাবিক উত্থান সংশয় তৈরি করে। এরপর থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রায় ৯৫ বার কোম্পানিটির সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ নির্বাহী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ডমিনেজ স্টিলের শেয়ার দরের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে একটি কারসাজি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে বাজারে আলোচনা রয়েছে। তার দাবি, ছাগলকাণ্ডের জন্য আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও তার সহযোগীদের হাতে কোম্পানিটির বিপুল পরিমাণ শেয়ার রয়েছে। মূলত উচ্চদরে এসব শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করা হয়েছে। এই কারসাজি চক্রের সঙ্গে এমন একজন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা আবুল খায়ের হিরুও জড়িত বলে তার দাবি।
অতীতে কারসাজির দায়ে হিরুকে কয়েকশ’ কোটি টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু গত কয়েক মাসে ডিএসই প্রায় শতবার সতর্কবার্তা দিলেও এবং কোম্পানিটির দুর্বল অবস্থা তুলে ধরলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিস্মকরভাবে নীরব রয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান থাকার সময় ২০২০ সালে ডমিনেজ স্টিল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। দুর্বল মানের কোম্পানিটির অনুমোদন নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল বিএসইসি। সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের সমর্থন থাকায় আইপিও অনুমোদনে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারে আনতে ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৩ কোটি শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। ৬৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের প্রায় পুরোটাই বা ৯৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ারবাজারে আসার আগে ১০ মাসে ইস্যু করে ডমিনেজ। ওইসময় পরিচালকেরা নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে অনেক প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করে। রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান ৫ লাখ ৫০ হাজার, মতিউরের মালিকানাধীন গ্লোবাল সুজ ১০ লাখ ও গ্লোবাল ম্যাক্স প্যাকেজিং ১০ লাখ প্লেসমেন্ট শেয়ার নেয়। বিভিন্ন মামলায় মতিউর এখন কারাগারে আছেন।
ডমিনেজ স্টিলের শেয়ার কারসাজির বিষয়ে জানতে আবুল খায়ের হিরুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘ডমিনেজ স্টিলের শেয়ার কারসাজির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটা গুজব হতে পারে।’
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশর (আইসিবি) চেয়ারম্যান পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বর্তমানে পুঁজিবাজারে শেয়ারদরে কারসাজির বিরুদ্ধে বিএসইসি কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগে মার্জিন লোন নিয়ে শেয়ার দর বাড়ানো হতো। বিএসইসির তৎপরতায় এখন এটি বন্ধ আছে। এখন ব্যক্তি পর্যায়ে নগদ টাকা দিয়ে অল্প পরিমাণে কারসাজি হয়ে থাকতে পারে। ডমিনেজ স্টিলের ক্ষেত্রে এমন কিছু হলে বিএসইসি অবশ্যই পদক্ষেপ নেবে।’
ডমিনেজ স্টিলের শেয়ারদরে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ঠেকাতে সক্রিয় উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি সেই প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘ডমিনেজ স্টিলের শেয়ার দরে কারসাজি হয়েছে কি না—সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’


