ইসলামি সেনাবাহিনীর সূচনা

সেনাবাহিনী মূলত জাতিসমূহের সংগঠন ও সভ্যতার প্রতিফলন। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সামরিক প্রতিষ্ঠান বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, তবেই তা আজকের সুসংগঠিত রূপ লাভ করেছে। ইসলাম এসেছিল একটি স্বতন্ত্র সামরিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে— পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হয়ে এবং একই সঙ্গে তা অতিক্রম করে।

ইসলাম-পূর্ব যুগে সেনাবাহিনী

প্রাচীনকালে সেনাবাহিনী বলতে বোঝাতো স্বতঃস্ফূর্ত জনতার সমাবেশ, যারা প্রয়োজনে একত্র হতো এবং প্রয়োজন মিটে গেলে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত— কোনো স্থায়ী কাঠামো বা সংগঠন ছিল না। মিসরের ফেরাউনি রাষ্ট্রকেই সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর ভিত্তি স্থাপনকারী প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হয়। দ্বিতীয় রামেসিসকে আজকের পরিচিত সামরিক ধারণা অনুযায়ী প্রথম পেশাদার সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। এরপর ব্যাবিলনীয় ও পারসিকরা ফেরাউনদের কাছ থেকে এই পদ্ধতি গ্রহণ করে। গ্রিকরা সারিবদ্ধ পদাতিক বাহিনীর কৌশল উদ্ভাবন করে, আর রোমানরা তার সঙ্গে বিভাগ ও দল বিভাজনের পদ্ধতি যুক্ত করে, যেখানে প্রতিটি বিভাগ ১০টি ইউনিট নিয়ে গঠিত ছিল।

ইসলাম-পূর্ব আরবদের কোনো সুসংগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না। যুদ্ধ ছিল গোত্রীয় বিষয়— অশ্বারোহী ও পদাতিক উভয়ে মিলে ধনুক, বর্শা ও তলোয়ার নিয়ে লড়াই করত। শৈশব থেকেই বালকদের অশ্বচালনা ও যুদ্ধকলায় প্রশিক্ষিত করা হতো, যাতে প্রয়োজনে নিজ গোত্রের রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে তারা।

নবী করিম (সা.)-এর যুগে সেনাবাহিনী

আল্লাহ যখন তাঁর রাসুল (রা.) ও সাহাবিদের যুদ্ধের অনুমতি দিলেন, তখন সামরিক সমাবেশ গড়ে উঠেছিল জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতার উপর নয়, বরং ঈমান, স্বেচ্ছাপ্রণোদনা ও মুক্ত ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে। নবী করিম (সা.) মুমিনদের জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করতেন, কিন্তু কাউকে বাধ্য করতেন না। যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসত তাদের সঙ্গে নিতেই তিনি পছন্দ করতেন। ‘হামরাউল আসাদ’ অভিযানে বের হওয়ার সময় তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, কেবল তারাই অংশ নেবে, যারা আগের দিন উহুদে উপস্থিত ছিল। আর যুদ্ধের আগে তিনি প্রায়ই বলতেন: ‘আমাদের সঙ্গে কেবল সে-ই বের হোক, যে জিহাদে আগ্রহী।’

সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তিনি ভিনদেশি উন্নত প্রযুক্তির আমদানি ও প্রয়োগে তিনি কোনো কার্পণ্য করতেন না। এ বিষয়ে খোদ আল্লাহ তায়ালারও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তিনি এরশাদ করেন: ‘আর তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী শক্তি প্রস্তুত করো…’ (সুরা আল আনফাল: ৮)। তাই হুনাইন যুদ্ধের পর তায়েফ অবরোধ করলে তিনি ফারসি সাহাবির পরামর্শক্রমে ‘মিনজানিক’ বা পাথরের মিজাইলের পারস্য প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে কালক্ষেপণ করেননি এবং সে যুদ্ধে তিনি বিজয়ও লাভ করেন। 

মক্কা বিজয়ের পর মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করলে ব্যাপক সমাবেশ সম্ভব হয়ে উঠল। তবু স্বেচ্ছামূলক অংশগ্রহণের চরিত্রই ইসলামি সেনাবাহিনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়ে গেল। আর সবচেয়ে সুশৃঙ্খল যে দিকটি ছিল, তা হলো নেতৃত্ব কাঠামো। নবী করিম (সা.) অভিযান পরিচালনার জন্য সেই ব্যক্তিকে নির্বাচন করতেন, যিনি সবচেয়ে সতর্ক ও যুদ্ধ বিষয়ে সর্বাধিক অভিজ্ঞ— মর্যাদায় উচ্চতর অন্য কেউ দলে থাকলেও। এই সুনিপুণ নেতৃত্ব-বাছাইয়ের ফলেই হামজা ইবন আবদিল মুত্তালিব, সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের মতো সামরিক ব্যক্তিত্বরা ইসলামি বিজয়ের পথকে আলোকিত করেছিলেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর যুগে সেনাবাহিনী

হজরত আবু বকর রা. একই নীতিতে চলেছিলেন— স্বেচ্ছাসেবীদের আহ্বান জানাতেন, পিছিয়েপড়াদের বাধ্য করতেন না। শাম ও ইরাক বিজয়ের সময় তিনি সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যে ফিরে যেতে চায়, তাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে এবং যার অন্তরে অনীহা আছ, তাকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করা যাবে না। তিনি তাদের ওপর নির্ভর করতেন, যারা মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং নবী করিম (সা.)-এর ওফাতের পরও ইসলামের ওপর অবিচল ছিল।

এভাবেই ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী সেনাবাহিনীর আবির্ভাব ঘটেছিল— জবরদস্তি বা বৈষয়িক স্বার্থের ওপর নয়, বরং দৃঢ় ঈমান, নৈতিক শৃঙ্খলা এবং সুনিপুণ নেতৃত্ব-বাছাইয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সম্মিলিত গুণাবলিই তাকে ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় বিজয়ের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।

শাহেদ হারুন

ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক