বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক বনিয়াদ গড়ে তুলতে ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার জন্য সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল পেমেন্টব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিউআর কোড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন করতে উদ্যোগ নিয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে দরকার দেশের মানুষের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সার্বিক উন্নয়ন।
দেশে নগদনির্ভর লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হলে দুর্নীতি, ঘুষ ও কর ফাঁকি কমে রাজস্ব আয় বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কিউআর কোড ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আরোপসহ ডিজিটাল পেমেন্ট বিস্তারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ অর্থাৎ ৭২ শতাংশের বেশি লেনদেন নগদ টাকায় সম্পন্ন হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে মোবাইল ব্যাংকিং ও কিউআর পেমেন্টে জোর দিতে হবে।
নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ানো গেলে বছরে দেড় থেকে ২ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ঘাটতি, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ এই সম্ভাবনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্যাশলেস রূপান্তরের গতি শ্লথ করে দিচ্ছে। এছাড়া নোট ছাপানো, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বণ্টনসহ নগদ ব্যবস্থাপনায় সরকারের যে বিপুল ব্যয় হয়, তা কমাতে ডিজিটাল লেনদেন অপরিহার্য। পাশাপাশি কাগুজে নোটের স্থায়িত্বও কমে গেছে। ছয় মাসের মধ্যেই অনেক নোট অচল হয়ে পড়ছে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার হলে শুধু ব্যয় সাশ্রয় নয়, অর্থনীতিতে গতিশীলতাও বাড়বে।
কিউআর কোড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সময় ও খরচ কমবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর ফাঁকি কমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। তবে এই অগ্রযাত্রা সহজ নয়। বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনে মানুষ এখনও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল, অনেক ক্ষেত্রে কর বা নজরদারি এড়ানোর উদ্দেশ্যেও নগদ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। তবে ডিজিটাল ওয়ালেট, মোবাইল ব্যাংকিং এবং কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার বাড়াতে পারলে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়া সফল হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটে ভর্তুকি দেওয়া উচিত সরকারের।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও নিরাপদ করতে সব মার্চেন্ট পয়েন্টে অর্থাৎ দোকান, রেস্টুরেন্ট, অনলাইন শপ, সেবাকেন্দ্রে একক ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর সঙ্গে আছে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং এবং তথ্য চুরির ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। ক্যাশলেস লেনদেনে সময় ও ব্যয় কমলেও সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হতে পারে। ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর স্বচ্ছতা ও ট্রেসেবিলিটি। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড থাকায় অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে। তবে একই সঙ্গে গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত বাস্তবায়ন। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করা, স্মার্ট ডিভাইসের সহজপ্রাপ্যতা এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা। ক্যাশলেস সমাজ বিনির্মাণে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব পক্ষকে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি সব অংশীদারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সেবার মান ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাশলেস লেনদেন সর্বত্র চালু করতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সব সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন পোর্টালে কিউআর কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের বিল, সরকারি ফি, পাসপোর্ট বা লাইসেন্স ফি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি বিল— সব ক্ষেত্রেই কিউআর কোড ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে। যারা কিউআর কোড ব্যবহার করবেন, তাদের জন্য বিশেষ ক্যাশব্যাক বা ইনসেনটিভের ব্যবস্থা করলে গ্রাহক ও বিক্রেতা উভয়ই উৎসাহিত হবেন। অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন উৎসাহিত করে আমরা একটি আধুনিক ও উন্নত অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারব।


