ঋণের বোঝা টেকসই উন্নয়নের বাধা
ড. সুলতান মাহমুদ রানা ।। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো ক্রমেই ঋণের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় একটি অংশ পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ক্ষুধা, রোগ, জলবায়ু ঝুঁকি, দুর্বল অবকাঠামো, শিক্ষার সীমিত সুযোগ ও স্থায়ী বেকারত্ব যেন এই দেশগুলোর স্থায়ী সঙ্গী হয়ে উঠেছে। কিন্তু সমস্যার মূল কেবল অর্থের ঘাটতি নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বৈশ্বিক সংহতির অভাবই আজকের সংকটকে গভীর করেছে। 

বিশেষ করে আফ্রিকান দেশগুলোয় ঋণ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে তীব্র। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩৫ শতাংশ যুব জনসংখ্যা আফ্রিকায় বসবাস করবে বলে পূর্বাভাস আছে। অথচ তাদের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ব্যবস্থা না করলে তা শুধু আফ্রিকার উন্নয়নকেই ব্যাহত করবে না; বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে। একইভাবে, দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশসহ অনেক দেশও আজ ঋণ ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করলেও, বৈদেশিক ঋণের বোঝা ক্রমে বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, ডলারের ঘাটতি, এলসি খোলায় সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি কঠিন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু তাই নয়, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতা ঋণের সুদ পরিশোধকে আরও জটিল করছে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে : উন্নয়ন টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের আরও সাশ্রয়ী, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ অর্থায়নের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। 

আজকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অন্যায্য এবং সংকটাপন্ন। বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির সময় অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রবাহিত হয়, কিন্তু সংকট দেখা দিলে তা দ্রুত বেরিয়ে যায়। অপরদিকে উন্নত দেশগুলো মন্দার সময়ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোয় ধারাবাহিকভাবে স্বল্প বিনিয়োগের শিকার হয়।

আফ্রিকার মতো, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়ও স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বদলে ভাড়া-খোঁজা রাজনীতির মাধ্যমে সংস্কার প্রতিহত করেছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। দুর্নীতি, স্বচ্ছতার ঘাটতি ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন প্রশাসন কার্যকর আর্থিক শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। 
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ২০২৫ সালের মার্চে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। সাত বছর আগে (২০১৬-১৭ অর্থবছর) যেখানে বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলার, তা এখন দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে প্রতিটি নাগরিকের কাঁধে ঋণের বোঝা দাঁড়িয়েছে গড়ে ৪৮৩ ডলার। ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনও সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও (প্রায় ২৩ শতাংশ), ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশকে প্রায় ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার সুদ ও আসল শোধ করতে হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৭ সাল নাগাদ এই বার্ষিক পরিশোধের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এ বাড়তি ঋণ শোধ করতে গিয়ে উন্নয়ন বাজেট সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোয় যেসব খাত সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ দাবি করে, সেগুলোতেই বরাদ্দ কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে প্রবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটে রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়ায় প্রায় ১১ শতাংশ, আর খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে মাত্র ৪ শতাংশে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ও বিনিয়োগ প্রবাহে। 

দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ সূচকে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ২৩ পয়েন্ট, ১৮০ দেশের মধ্যে অবস্থান ১৫১তম। দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং দীর্ঘসূত্রতার ফলে ঋণের সুদ ও পরিশোধের চাপ আরও জটিল হয়ে ওঠে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করেছিল দুর্নীতির অভিযোগে, যার ফলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় শিক্ষা। 

ঋণ সংকট সমাধান ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সার্বভৌম ঋণ পুনর্গঠনের একটি কার্যকর বৈশ্বিক কাঠামো দরকার। কোভিড-১৯ এর সময় চালু হওয়া সাধারণ কাঠামো বাস্তবে কোনো প্রণোদনা সৃষ্টি করতে পারেনি। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন অর্থায়ন পেলেও তার বেশিরভাগই পুরোনো ঋণ শোধে ব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ অভিজ্ঞতা সত্য—নতুন প্রকল্প অর্থায়নের চেয়ে ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ ক্রমেই বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ দিতে হবে। ঋণ সব সময় ক্ষতিকর নয়; বরং পরিকল্পিত ও স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করা হলে তা অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নে অবদান রাখে। এ জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ছাড়যুক্ত ঋণ ও দেশীয় মুদ্রায় মূলধন বাজার গড়ে তোলা। 

বাংলাদেশ যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে দক্ষ হতে পারে, তবে বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। তৃতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য মূলধন ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ঋণ রেটিং সংস্থাগুলো আফ্রিকান ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর ঝুঁকিকে অতিরঞ্জিত করে, যার ফলে ঋণের সুদ অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায়। অথচ তথ্য বলছে, আফ্রিকায় অবকাঠামো ঋণের খেলাপি হার বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশও তুলনামূলকভাবে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে এসেছে, কিন্তু বাজার-চালিত ঝুঁকির ধারণা আমাদের ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশের জন্য এ প্রেক্ষাপটে তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি : (১) অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ : করব্যবস্থার সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ ও প্রবাসী আয়কে আরও কার্যকরভাবে মূলধন হিসেবে কাজে লাগানো; (২) প্রকল্প ব্যয়ের জবাবদিহিতা : উন্নয়ন প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ ও ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধে শক্তিশালী তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা; (৩) আন্তর্জাতিক সংহতির দাবি : বৈশ্বিক ফোরামে ন্যায্য অর্থায়ন কাঠামোর জন্য সক্রিয় কূটনীতি চালানো। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক আর্থিক আলোচনায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

একটি ন্যায্য বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ঝুঁকি বণ্টনের ভার বহন করার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া উচিত। বর্তমান ব্যবস্থা তার উল্টো কাজ করছে—যা দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও দুর্বল করে তুলছে। যদি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্ব টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যদি অর্থায়নের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না আনা যায় তবে প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হলেও তা ধরে রাখা অনেক কঠিন। তাই এখনই সময় বৈশ্বিক সংহতি, সাশ্রয়ী অর্থায়ন ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সময়ে এগিয়ে যাওয়ার। অন্যথায় উন্নয়নের স্বপ্ন ঋণের বোঝাতেই চাপা পড়ে যাবে।

অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]