নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছালেও স্মার্টফোন ব্যবহারে জেলাভিত্তিক বড় ব্যবধান দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, স্মার্টফোন ব্যবহারে ফেনী ও কুমিল্লা শীর্ষে থাকলেও উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামসহ কিছু উপকূলীয় জেলা পিছিয়ে রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস কার্যালয়ে ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ শীর্ষক প্রকল্পের জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারের এই বৈষম্য দূর না হলে ডিজিটাল সেবা ও ইন্টারনেটভিত্তিক অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, দেশে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। আর মোট নাগরিকের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হার মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর খানা বা পরিবারে স্মার্টফোন রয়েছে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ। বিভাগীয় হিসাবে ঢাকার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম। এই বিভাগের ৮৬ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন আছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খানা পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে শীর্ষ-১০ এর তালিকায় রয়েছে ফেনী জেলা। এ জেলায় খানা পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কুমিল্লা জেলা, স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ। চট্টগ্রাম জেলায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নোয়াখালীতে ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহারের হার। স্মার্টফোন ব্যবহারে ৮৬ শতাংশের ঘরে রয়েছে ব্রাক্ষণবাড়িয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা।
ঢাকা শহরে ইন্টারনেট এবং ওয়াইফাই সুবিধা থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ দশের আট নম্বর তালিকায় রয়েছে ঢাকা জেলা। এ জেলায় খানা পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে চাঁদপুর ও শরীয়তপুর জেলা। এ জেলায় স্মার্টফোন ব্যবহারের হার যথাক্রমে ৮৩ দশমিক ৯ এবং ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে স্মার্টফোন ব্যবহারে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, ঝালকাঠি, শেরপুর ও নীলফামারী। এসব জেলায় স্মার্টফোনের বিস্তার তুলনামূলকভাবে কম, যা আধুনিক ডিজিটাল সেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত করে দিচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খানা পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে পিছিয়ে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রাম জেলা। এ জেলায় স্মার্টফোন ব্যবহারের হার যথাক্রমে ৫০ দশমিক ১ শতাংশ ও ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ। পিছিয়ে থাকা জেলার মধ্যে ঝালকাঠিতে স্মার্টফোন ব্যবহার হয় ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে শেরপুর ও নীলফামারি জেলা। এই দুই জেলায় স্মার্টফোন ব্যবহারের হার যথাক্রমে ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, রংপুর জেলায় খানা পর্যায়ে স্মার্টফোনের ব্যবহার ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও লালমনিরহাটে এর ব্যবহার ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যবহার ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং গাইবান্ধায় এর ব্যবহার ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন মাসে ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারি চাকরি সংক্রান্ত তথ্য খুঁজেছেন, যা সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খেলাধুলা সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান, যা ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী অনলাইনে কেনাকাটা করেছেন।
ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে কপি-পেস্ট করার মতো মৌলিক কাজের বাইরে নিরাপত্তা সচেতনতার কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে জরিপে। ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা সাইবার আক্রমণের শিকার হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে ঝুঁকির জায়গাও রয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার।
এছাড়া উচ্চমূল্যের কারণে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক ইন্টারনেট সেবা গ্রহণে অনাগ্রহী বলে জানিয়েছেন, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে বিবিএসের জরিপ বলছে, দেশে ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও ইন্টারনেট ব্যবহার করে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশজুড়ে এখনও ইন্টারনেট পরিষেবা বঞ্চিত প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ। মুঠোফোন ব্যবহারের দিক থেকে পুরুষের চেয়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ পিছিয়ে আছেন নারীরা। পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশ আর নারীদের হার ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে মুঠোফোনের মালিকানার দিক থেকে নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশ পিছিয়ে আছেন। বর্তমানে ৭০ শতাংশ পুরুষের নিজের অন্তত একটি মুঠোফোন আছে, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ। স্মার্টফোন ব্যবহার করা পুরুষ ৫০ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারী ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারেও নারীরা পিছিয়ে আছেন। বর্তমানে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। বিপরীতে নারীদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৫০ দশমিক ২ শতাংশের কিছু বেশি।


