- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জ্বালানি ঝুঁকির মধ্যে উৎস বহুমুখীকরণে জোর
- এলএনজি আমদানিতে জি-টু-জি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেটে ২৪ প্রতিষ্ঠানের এমএসপিএ তালিকা নবায়ন চলমান
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণে জোর দিচ্ছে সরকার। এ জন্য নতুন জ্বালানি উৎসের অনুসন্ধান ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি হ্রাসে সমন্বিত কৌশল নেওয়া হচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জ্বালানি সরবরাহ উৎস আরও বিস্তৃত করতে নতুন অংশীদার খোঁজার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। এ লক্ষ্যে আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি সকার ট্রেডিং এসএর সঙ্গে জি-টু-জি বা সরকারিভাবে স্বল্পমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটি সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে নতুন নির্ভরযোগ্য উৎস যুক্ত হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উৎস, সরবরাহ পদ্ধতি এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা— সব ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বা অন্য কোনো সংকটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশ যাতে বিপদে না পড়ে সে লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি চলছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে সরকার খনিজ সম্পদের গভীরতর অনুসন্ধান জোরদার করার উদ্যোগের কথা থাকবে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ জ্বালানি রূপান্তর ও শিল্পায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল’ অনুসন্ধানের ওপর বাড়তির গুরুত্বের কথা থাকছে। পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানির বাইরে ফ্রন্টিয়ার জ্বালানি খাতে অর্থাৎ সাগরের গ্যাস, অপ্রচলিত হাইড্রোকার্বন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এসব ক্ষেত্রে উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথাও তুলে ধরবেন তিনি।
এছাড়া আমদানির উৎসও বহুমুখীকরণের কৌশল নেওয়ার কথা থাকছে বক্তৃতায়। এতদিন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলেও এখন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি আমদানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, একক অঞ্চলনির্ভর আমদানি কাঠামো থেকে বের হয়ে বহুমাত্রিক উৎস ও বাজারভিত্তিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলেই টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
এখন বাংলাদেশ জি-টু-জি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় চারটি দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করছে। কাতার, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে মোট সাতটি চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দীর্ঘমেয়াদি এবং দুটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি। এসব চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং, ওকিউ ট্রেডিং, এক্সেলারেট ও আরামকো ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে।
সূত্র জানায়, চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি ক্রয় করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাস্টার সেল অ্যান্ড পারচেজ এগ্রিমেন্ট (এমএসপিএ) কাঠামোর আওতায় ২৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিদ্যমান তালিকা অনুসরণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে দ্রুত এলএনজি সংগ্রহ করতে এবং সরবরাহ ঘাটতি পূরণে এমএসপিএ তালিকা নবায়নের কাজ চলছে।
এদিকে জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামো সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলা এবং সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

