নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, জ্বালানি খাতে ছোট, বড় ও মাঝারিমানের অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই পুরোপুরি হারিয়ে গেছেন। এক সময়ের সফল ঘরোয়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার অস্তিত্ব এখন আর নেই। ২০ বছর মেয়াদি এ বিনিয়োগ পাঁচ থেকে ছয় বছরে কেন শেষ হয়ে গেল, খতিয়ে দেখা দরকার।
গতকাল সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নির্ভরতা থেকে স্বনির্ভরতার পথে:
বাংলাদেশে ন্যায্য পরিবর্তনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগের রূপরেখা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এই গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খানের সঞ্চালনায় বৈঠকে ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের পরিচালক (যগ্ম সচিব) ড. দিদারুল আলম, ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনের (বিজিইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান দিপাল চন্দ্র বড়ুয়া, আরএফএল গ্রুপের রিনিউঅ্যাবল এনার্জির সিওও নূরে আলম, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর এম মোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজার ৯০ শতাংশ ঋণের ওপর নির্ভরশীল। নিজস্ব মূলধনেরও অভাব রয়েছে। এছাড়া শুরুর দিকে অনেক বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির আশঙ্কা করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অবশ্যই কৃষিজমি ব্যবহার করতে হবে— এটি ভুল ধারণা। চাষযোগ্য জমি ব্যবহার না করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকেন্দ্রীকৃত কৌশল নেওয়া দরকার। এছাড়া শক্তি সঞ্চয় করে রাখার উন্নত ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ আদান-প্রদানের হিসাব রাখার আধুনিক পদ্ধতি (নেট মিটারিং) প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
আবাদি জমি নষ্ট না করে শিল্প-কারখানার ছাদ, অব্যবহৃত জলাশয় ও সেচ পাম্প ব্যবহার করে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে জানিয়েছে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিতে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিকল্প নেই।
গবেষণায় দেখা যায়, দেশে জ্বালানি খাতের প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ‘জিরো-অ্যারেবল ল্যান্ড’ কৌশল অনুসরণ করে ২০৪০ সালে জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। তৈরি পোশাকসহ বৃহৎ শিল্প খাতের কারখানার ছাদে প্রায় ৪ কোটি বর্গফুট জায়গা থাকে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা শিল্পের নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা যাবে।
অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, দেশে সৌরবিদ্যুতের দুটি দিক রয়েছে— একটি হলো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নিজেদের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অন্যটি হলো- যা জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। বর্তমানে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট হলেও গত কয়েকদিনে উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়নি। প্রশ্ন হলো, এই ঘাটতি কেন? একইভাবে বায়ুবিদ্যুতের সক্ষমতা ৬২ মেগাওয়াট হলেও কুতুবদিয়ায় তা ব্যর্থ হয়েছে বাতাসের অভাবের অজুহাতে। এ প্রযুক্তিগুলো কেন সফল হচ্ছে না, তা ভাবা দরকার। জ্বালানি খাতে দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই ব্যর্থতাগুলোর উত্তর খোঁজা দরকার। বিআইডিএসের মহাপরিচালক আরও বলেন, জ্বালানি খাতের অনেক উদ্যোক্তা পুরোপুরি হারিয়ে গেছেন। যেমন- একসময়ের সফল ঘরোয়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার এখন আর অস্তিত্ব নেই। ২০ বছরের জন্য করা এত বড় বিনিয়োগ পাঁচ থেকে ছয় বছরে কেন শেষ হয়ে গেল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
দিপাল চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, জ্বালানি সংকটে বর্তমান দেশের অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সবাই সবার কথা শোনে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এই পরিস্থিতিতে কিছু কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত খাতের অর্থায়ন এবং অন্যান্য উৎস থেকে আরও অর্থ সংগ্রহের উপায় নিয়ে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন গবেষক এম জাকির হোসেন খান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ‘সবুজ জলবায়ু তহবিল’ ও ‘জলবায়ু বিনিয়োগ তহবিলের’ মতো যেসব উৎস এখনও সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি, সেগুলোতে নজর দিতে হবে। বর্তমানে তাদের কাছে ৭০০ থেকে ২ হাজার কোটি ডলারের বিশাল বিনিয়োগ ক্ষেত্র রয়েছে। তারা মানুষ, প্রকৃতি ও জলবায়ুর জন্য আলাদা অর্থায়ন ব্যবস্থাও করেছে। এ ধরনের উদ্ভাবনী উৎসগুলো থেকে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে এখনই ভাবার উপযুক্ত সময়।

