অবাস্তব বাজেট হলে সংকট  আরও ঘনীভূত হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বাজেট বাস্তবসম্মত না হলে বর্তমান সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে জানিয়েছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় অতিরঞ্জিত বা ‘কাগুজে’ বাজেট দিলে তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। বাজেট হতে হবে বাস্তবসম্মত, সংযত এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে। তা না হলে সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠবে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ বহু গুণ বাড়বে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ড. দেবপ্রিয়। এ সময় ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ প্রমুখ।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজেটে অতিরঞ্জিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তা বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা কমবে। নীতিনির্ধারণে বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়বে এবং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে অতিরিক্ত ব্যয় করার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চাপে। বৈশ্বিক অস্থিরতা আগের আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে প্রকট করেছে। সে জন্য কঠোর আর্থিক বাজেট করতে হবে। সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দয় হতেই হবে।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, তিন-চার মাসের জন্য রূপরেখা দেওয়া দরকার। এটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো করা যেতে পারে।

সরকারের ব্যয় কমাতে ভর্তুকি সামঞ্জস্য করার পরামর্শ দেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, ভর্তুকির সুবিধা দরিদ্র নাকি ধনী পাচ্ছেন, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। নগদ প্রণোদনা দুই-তিন ধাপে কমিয়ে আনতে হবে।

বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) পর্যালোচনার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কাজটি এক-দেড় মাসের মধ্যে করতে হবে। এটি না করে আগের মতো প্রকল্প নিলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।

অবাস্তব বাজেট না করার ওপর জোর দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়, সেটি অর্জিত হবে না, এনবিআরও জানে। তাই রাজস্ব আয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বাজেটের আকার আগের চেয়ে ছোট হলেও এটি করতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, কর অবকাশের সুবিধা বাদ দিতে হবে। কর কমিয়ে করজাল বৃদ্ধি এবং কর আদায়ে ডিজিটাইজেশন ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সম্পদের ওপর কর বসাতে হবে। এনবিআর দুই ভাগ করার প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার বলে জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে ত্রিমুখী চাপে রয়েছে— জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। এগুলো একসঙ্গে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ। এই অতিরিক্ত ব্যয়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে। সেইসঙ্গে রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে এবং টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বাড়াবে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

জ্বালানি নীতি নিয়ে সরকার দ্বিধায় আছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে জ্বালানির ওপর প্রায় ৩২ শতাংশ কর রয়েছে। এই কর কমালে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু এতে রাজস্ব কমে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। আবার কর অপরিবর্তিত রাখলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। ফলে সরকারকে একটি জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে।

বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিরও সমালোচনা করেন তিনি। প্রায় এক হাজার প্রকল্পের গড় বাস্তবায়ন মেয়াদ সাড়ে পাঁচ বছর। এর অনেকগুলোই বারবার সংশোধনের কারণে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে তা মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব ব্যয় যথাক্রমে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ এবং দেড় শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কাঠামোগত সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তি নিয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো জানান, এতে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।

নতুন পে-স্কেল নিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মেয়াদের শেষ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পে-স্কেল সংক্রান্ত উদ্যোগ বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। এই সরকারের উচিত কমিশন গঠন করে এটা বিবেচনা করা। এ ক্ষেত্রে আগের সরকারের পে কমিশনের রিপোর্টটি একটা উপাদান হিসেবে বিবেচনা কো যেতে পারে। প্রশ্নহীনভাবে এটা বিবেচনার সুযোগ তাদের নেই।

পাচারের অর্থ দেশে ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দেশের ও বিদেশে জব্দ করা সম্পদ দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে হবে।