৭৫৫ কোটির রাজস্ব ফাঁকি ইস্টার্ন রিফাইনারির
  • বিপিসির পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মোট রাজস্ব ফাঁকি ৪,৬১২ কোটি টাকা
  • ২০২২-২০২৫ সময়ে ৪৮টি বিল অব এন্ট্রিতে কম রাজস্ব পরিশোধ
  • চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের চূড়ান্ত দাবিনামা জারি, ৩০ দিন সময়
  • অনুসন্ধানে ৬৯৫টির জায়গায় মিলেছে ১,০৪৭টি বিল অব এন্ট্রি 
  • ১৪৬টি জাহাজ সংশ্লিষ্ট আমদানিতে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে
  • রাজস্ব কম পরিশোধ স্বীকার ইস্টার্ন রিফাইনারির, শুধু শুল্ক দিতে রাজি
  • শুল্ক, ভ্যাট, আগাম কর ও উৎসে কর সব দিতে হবে: এনবিআর 
  • কাস্টমস আইনের দুটি ধারায় ৭৫৫ কোটি টাকার দাবিনামা 
সাইদুর রহমান নোমান, ঢাকা: গত চার বছরে তেলের আমদানি মূল্য কম দেখিয়ে মোট ৭৫৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনকারীর প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিডিটেড (ইআরএল)। ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪৮টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে এই পরিমাণ রাজস্ব অপরিশোধিত রয়েছে বলে সম্প্রতি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। ওই দাবিনামা অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারিকে অপরিশোধিত এই রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রমতে, কেবল ইস্টার্ন রিফাইনারি নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন আর চারটি তেল কোম্পানিও ব্যাপক রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। পদ্মা ওয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা ওয়েল ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি মোট ৩ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা কম রাজস্ব পরিশোধ করেছে। এর সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির ফাঁকি দেওয়া ৭৫৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা যোগ করে বিপিসির পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কাছে শুল্ক-কর বাবদ এনবিআরের মোট দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬১২ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়।

জাতীয় অর্থনীতির হাতে আসা চূড়ান্ত দাবিনামার নথি অনুযায়ী, বিপিসির এই অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানিকৃত পণ্য চালানের বিপরীতে শুল্ক-কর ফাঁকির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে তা আদায়ের লক্ষ্যে বিপিসি, এর পাঁচ অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ও চট্টগ্রামের রাজস্ব কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্তে ২০২৫ সালের ৩০ জুনের আগে দাখিল করা বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর ইনভয়েস ও অন্যান্য দলিলাদি পর্যালোচনা করা হয়।

কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে দাখিল করা নথি পর্যালোচনা করে বিপিসির পাঁচটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মিলে মোট ৬৯৫টি বিল অব এন্ট্রি দেখায়। কিন্তু অনুসন্ধানে আমদানির সঙ্গে ১৪৬টি জাহাজসংশ্লিষ্ট সর্বমোট ১ হাজার ৪৭টি বিল অব এন্ট্রি পওয়া যায়। এর বিপরীতে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর মিলে মোট ৪ হাজার ৬১২ কোটি ৯৭ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৭ টাকা ১২ পয়সার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ মিলে। এর মধ্যে ৪৮টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ফাঁকির পরিমাণ ৭৫৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। 

নথি সূত্রে জানা যায়, ৭৫৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাজস্ব ‘কেন আদায়যোগ্য হবে না’ তা জানতে চেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি ইস্টার্ন রিফাইনারিকে দর্শানোর নোটিশ দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। পরে গত ফেব্রুয়ারি বিকালে কোম্পানির চাওয়া অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে শুনানি হয়। প্রতিনিধি ৭৫৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাজস্ব কম পরিশোধের হিসাব সঠিক বলে মত দেন। কিন্তু ইনভয়েস ভ্যালুতে দাবিনামা জারির ক্ষেত্রে ‘শুধু আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য হতে পারে’ মর্মে মত দিয়ে পৃথক কমিটি গঠন করে সরকারের কাছে প্রকৃত পরিশোধযোগ্য রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণের সুপারিশ করেন।

তবে এনবিআর বলছে, কাস্টমস আইন অনুযায়ী, আমদানিকৃত বা রপ্তানিতব্য সব পণ্যের ওপর প্রথম তফসিল বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীন নির্ধারিত হারে কাস্টমস শুল্ক প্রদেয় হবে। এছাড়া মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী, কাস্টমস আইনের অধীন যে পদ্ধতিতে ও সময়ে আমদানি শুল্ক আদায় করা হয় সেই একই পদ্ধতি ও সময়ে আমদানির ওপর আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য না হলেও করযোগ্য আমদানির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায় করতে হবে। একই আইনে করযোগ্য আমদানির ওপর যে সময় ও পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করা হয়, সেই একই সময় ও পদ্ধতিতে করযোগ্য আমদানির ভ্যাট আরোপযোগ্য ভিত্তিমূল্যের ওপর এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে আগাম কর পরিশোধ করতে হয়। আর আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অনুযায়ী আমদানি মূল্যের ওপর নির্ধারিত অনধিক ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর সংগ্রহের বিধান আছে। সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, আমদানি পর্যায়ে পরিশোধযোগ্য এসব রাজস্ব আমদানি পর্যায়েই পরিশোধ করতে হবে।

তাই কাস্টমস আইন, ১৯৬৯ এর ধারা ৮৩ (ক) অনুযায়ী ৩২টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ৫১১ কোটি ১৫ লাখ ১৩ হাজার ১৬০ টাকা এবং কাস্টমস আইন, ২০২৩ ধারা ৯১ (৩) অনুযায়ী ১৬টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ২৪৪ কোটি ৩০ হাজার ৩১৪ টাকা অর্থাৎ মোট ৭৫৫ কোটি ১৫ টাকার চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে কাস্টম হাউজ। এর মধ্যে ২০২২ সালের দুটি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা, ২০২৩ সালের ৩০টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ৫০৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা, ২০২৪ সালের দুটি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ১১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালের ১৪টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা রাজস্ব কম পরিশোধ করা হয়েছে। এই বকেয়া রাজস্ব গত ৫ এপ্রিল থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।

রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স বিভাগ) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘যেহেতু চট্টগ্রাম কাস্টমস কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েছে। তাই অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোই ভালো জানে।’ ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপক (অডিট) মীর মুঃ মাঈনুল ইসলাম বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি জানি না। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।’ এই বিষয়ে বক্তব্য নিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপক পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী শরীফ হাসনাতকে দুই দিন ধরে বার বার কল ও বার্তা দেওয়া হলেও সাড়া মেলেনি।