- উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সুদহার ও ডলার সংকটে ব্যবসা কঠিন হওয়ায় এসএমই সুরক্ষার দাবি
- উৎপাদন ব্যয় কমাতে রপ্তানির ওপর ধার্য ১ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের অনুরোধ এপেক্সের
- সিরামিক ও স্যানিটারির মতো শিল্পে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট কমানোর দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি খাত নিয়ে ছয়টি প্রস্তাব করে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। করজাল সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, করপোরেট কর কমানো, ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল তৈরি, পিএসআর ও আইনি অসঙ্গতি দূর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং এসএমই খাতকে সুরক্ষা প্রদানের বাজেট প্রস্তাব পেশ করে এই সংগঠনটি।
গতকাল রোববার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব প্রস্তাব করে সংগঠনটির সভাপতি। এমসিসিআই এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারাও বাজেট প্রস্তাব করেন।
এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, উচ্চ সুদহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এসব কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘দেশে এক কোটির বেশি টিআইএন থাকলেও অর্ধেকেরও কম রিটার্ন জমা দেন। আমাদের প্রস্তাব হলো— এনআইডি ও টিআইএন ডেটাবেজ পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূত করা। এছাড়া নতুন করদাতাদের ভীতি দূর করতে বছরে মাত্র ১০০ বা ১ হাজার টাকার প্রতীকী ন্যূনতম কর এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজ রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা হোক।’
এমসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির প্রাণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এই খাতের বিকাশে পৃথক কর হার এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট হ্রাস করা হলে দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।’ ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বাজেটে বড় অঙ্কের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে তা বিদ্যমান করদাতাদের জন্য হয়রানির কারণ হতে পারে।’
সিরামিক শিল্পের পক্ষ থেকে সাকিব বান্নি বলেন, ‘সিরামিক খাত একটি উদীয়মান শিল্প খাত এবং এখানে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি রয়েছে। আমদানি পর্যায়ে সিরামিক পণ্যের ওপর শুল্ক ছাড়াও ৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত হয়। এর পাশাপাশি ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কও প্রযোজ্য। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। আমরা মৌলিক মাটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল আমদানি করি, যা সিরামিক পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। মৌলিক মাটির ওপর আমদানি শুল্ক শতাংশ কিন্তু অন্যান্য কাঁচামালের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। আমাদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে এই শুল্ক যৌক্তিকভাবে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত।’
স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপার খাতে উৎপাদন পর্যায়ে ছাড় বহাল রাখার দাবি
স্কয়ার কোম্পানির সিইও বলেন, ‘স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপার খাতে উৎপাদন পর্যায়ে যে ব্যাপক এক্সেম্পশন আছে, সেটা যেন বহাল থাকে। কাঁচামাল পর্যায়ে যে ট্যাক্স আছে সেটা যেন আরও কমে আসে— এটা ১০ শতাংশ এ নামিয়ে আনা সম্ভব। কারণ ব্রিদেবল ব্যাক শিট, এয়ার লেড পেপার এগুলোর কোনোটাই বাংলাদেশে তৈরি হয় না। এমন না যে বাংলাদেশে কেউ বানায় না, বরং এই ধরনের উৎপাদনে অত্যন্ত বড় মাপের বিনিয়োগ দরকার, যা এখনও কেউ করেনি।’
এপেক্স কোম্পানির চেয়ারম্যান গোলাম মাউনউদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যারা ট্যাক্স দেন, তাদের ওপরই চাপ বেশি। যারা দেন না, তাদের ধরা হয় না। ভ্যাট বেস বাড়ানো দরকার। কোন খাতে ভ্যাট আরোপ করা যায়, তা খুঁজে বের করতে হবে। ভ্যাট পরিশোধকারী ও অপরিশোধকারীর মধ্যে যেন কোনো বৈষম্য না থাকে। এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে ব্যাংক ১ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেয়। এটি উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। রপ্তানিকারকদের ওপর থেকে এই ১ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।
ইনসেপ্টা কোম্পানির প্রতিনিধি বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাটারি প্যাক ও ব্যাটারি সেল উভয়ের ওপর ৬১ শতাংশ আমদানি শুল্ক (টিপিই) প্রযোজ্য। এই বিশাল শুল্কের কারণে কোনো উদ্যোক্তার পক্ষে স্টোরেজ সিস্টেম স্থাপন করা ব্যবসায়িকভাবে সম্ভব নয়। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, এনবিআরকে দ্রুতে এসআরও জারি করতে এবং ব্যাটারি ও স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেওয়া হোক।’
ইউনিলিভার কোম্পানির আব্দুল্লাহ মামুন চৌধুরী বলেন, ‘ইএইউআর সার্টিফিকেশন পাওয়া যাচ্ছে, সেটা আছে। কিন্তু আমি যেটা বলব, ইএইউআর সার্টিফিকেশন নেওয়া এবং সেটা কনটিনিউ করার যে প্রক্রিয়া, যে এসআরও সেটাকে আরও সুনির্দিষ্ট করা উচিত। অনেক অপ্রয়োজনীয় রিকোয়ারমেন্ট আসছে, যেগুলো কাস্টমারের সঙ্গে বা আমার ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের সঙ্গে সম্পর্কিত না। এগুলো বন্ধ করতে হবে।’
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, ‘সারা বছর কোথায় সঞ্চয় করব, কোথায় বিনিয়োগ করব— সরকার সে বিষয়ে কত ট্যাক্স নেবে, তা যদি আগে থেকে না জানি, তাহলে সারা বছর অন্যভাবে বিনিয়োগ করে যাই। আর ১ জুলাই থেকে জুনের অর্থবিধিতে যে ভ্যাট বা ট্যাক্স রেট নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই আমার চলতি বছরের ট্যাক্স মূল্যায়নে প্রযোজ্য হয়। ট্যাক্স ইয়ার ও ফিন্যান্সিয়াল আমরা তিনটি বিষয় চিহ্নিত করেছি এনবিআরকে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের আওতায় আনা। নীতি সরলীকরণ করা দরকার।’


