৯,৮০০ কোটিতে সুফল নেই আরও ৪৫ কোটি চান মেয়র
হাসান আরিফ, ঢাকা: চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে চলমান চারটি বৃহৎ প্রকল্পে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে; কিন্তু এখনও বর্ষা এলেই তলিয়ে যায় বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত এই বন্দরনগরী। ৫ থেকে ১১ বছর ধরে চলা এসব প্রকল্পের মধ্যে তিনটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে, আর একটি এখনও সময়সীমার মধ্যে থাকলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাঙ্ক্ষিত সুফল নেই। উল্টো প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে এসে ২৬টি বড় সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে সরকারি এক প্রতিবেদনে। এই বাস্তবতায়, চলতি বর্ষার আগেই পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে ৪৫ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চেয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এই বরাদ্দ পেলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে বলে মনে করছেন বর্তমান মেয়র।

চসিকের দাবি, গত বর্ষা মৌসুমে সমন্বিত উদ্যোগের ফলে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে ১৫ কোটি টাকা, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে আরও ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে খাল ও ড্রেন পরিষ্কার করা হয়। এতে প্রথমবারের মতো বর্ষায় জলাবদ্ধতা কিছুটা কমে আসে, যা প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

চলতি বছর বর্ষার আগে পরিস্থিতি সামাল দিতে দুটি খাতে জরুরি বরাদ্দ চেয়েছে সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ২৫টি খাল থেকে প্রায় এক কোটি ঘনফুট মাটি ও আবর্জনা অপসারণে ২৫ কোটি টাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার সার্ভিস ড্রেন পরিষ্কারে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। মোট ৪৫ কোটি টাকার এই বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হবে এবং বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীর দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে তাদের দাবি।

চসিকের মেয়র শাহাদাত হোসেন সমস্যার সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা সমাধানের জন্য কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান ৩৬টি খালের সঙ্গে আরও ২১টি খাল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ কমে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি। 

এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীনের কার্যালয় থেকে প্রস্তুত করা এক বিশদ প্রতিবেদনে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের সুপারিশ তুলে ধরা হয়। গত বছরের ৯ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়, যেখানে মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়— বহু অর্থ ব্যয়ের পরও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি, বরং সমন্বয়হীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে চার প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, ৫ হাজার ৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও সংস্কার প্রকল্পে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর তীরে রাস্তা ও জলকপাট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বহদ্দারহাট থেকে বলিরহাট পর্যন্ত নতুন খাল খননে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২৭০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যয় করেছে ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে ৩৬টি খালের সংস্কার কাজ চলছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটির অগ্রগতি এখন ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫টি খালের কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি খালগুলোর কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ ও মুরাদপুর এলাকার হিজড়া খালের কাজ আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে এখনও শুরুই হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব। একই সঙ্গে খাল ও খালের পাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আইনি জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণকাজ বার বার থমকে যাচ্ছে। যদিও এসব সমস্যা আগে থেকেই চিহ্নিত ছিল, তবুও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

তবে বাস্তবতায় হলো তিনটি পৃথক সংস্থা— চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড— সমন্বয়হীনভাবে কাজ করায় প্রতিবছর বর্ষায় ১০ থেকে ১৩ বার পর্যন্ত নগর ডুবে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও নদী গবেষক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, নগরীর খালগুলোর পানি ধারণ ও নিষ্কাশন সক্ষমতা নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা নেই। কালুরঘাট থেকে কর্ণফুলী নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ২০টি ডুবন্ত চর ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। তার ভাষায়, সমন্বয়হীনভাবে খনন কাজ করে নদীগুলোকে কেবল ক্ষত করা হয়েছে, কিন্তু কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে, যার ফলে স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে গেছে।

এই বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা টাকা কামানো ও বানানোর বড় প্রকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খাতে যত টাকা ব্যয় হয়েছে তার ওপর একটা নিরপেক্ষ অডিট হওয়া প্রয়োজন। আর এই জলাবদ্ধতার প্রকৃত সমস্যা সমাধানের জন্য একটা কার্যকরী মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা দরকার। নয় তো এই ভাবেই চলতে থাকবে।