সংস্কারে বড় বাধা দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রবণতা
‌‘সংস্কার কারা চায়, কারা বাধা দেয় তা তদারকি করা দরকার’
- রেহমান সোবহান, চেয়ারম্যান, সিপিডি

‘সংস্কারের মাধ্যমে আমলারা তাদের ক্ষমতা হারাতে চান না।’ 
-মুসলিম চৌধুরী, সাবেক অর্থ সচিব

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশ সংস্কারের জন্য একটি রূপরেখা বা নকশা করা যতটা সহজ, বাস্তবে কার্যকর করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে সংস্কারের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু তারাও প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে সফল হয়নি। মুখে সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ত্রুটি এবং দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রবণতাই এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গতকাল রোববার রাজধানীতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে প্লেনারি অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের শেষদিন ছিল গতকাল। এ দিন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের সঞ্চালনায় অধিবেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। 

‘রোমান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি’ শীর্ষক অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় তিনি বলেন, সম্প্রতি সংস্কার নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মালিকানার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশাসনিক বিভাজন ও অদক্ষতা এবং কর্তৃত্ববাদে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এছাড়া দুর্বল নীতিমালা প্রণয়ন ও অবাস্তব লক্ষ্য, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বয়ের অভাব এবং দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রবণতাকে সংস্কারের বড় বাধা হিসেবে দেখছেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক সময় সংস্কার শুরু হলেও তা গতি হারায় এবং পথভ্রষ্ট হয়। যেমন ৯০-এর দশকে রাশিয়ার বাজার অর্থনীতি সংস্কার শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাঙ্গেরিতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পিছুটান লক্ষ্য করা গেছে। তুরস্কেও গত ২০ বছরে অনেক অস্থিরতা গেছে, যেখানে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ও টানাপড়েন দেখা গেছে। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে সংস্কার সফল না হয়ে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।

সংস্কারের মাধ্যমে আমলারা তাদের ক্ষমতা হারাতে চান না বলে মনে করেন সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, আমলাতন্ত্রের পক্ষ থেকে আসা বাধার কারণেই অন্তবর্তী সরকার সংস্কারের কাজে খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। এছাড়া অনেক আগে অবসর নেওয়া আমলাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছিল যাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা ছিল না। 

মুসলিম চৌধুরী আরও বলেন, রাজনৈতিক বৈধতার অভাবে থাকা সরকারের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের এই প্রভাব বেশি দেখা যায়। তবে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এই অবস্থায়ও যদি সংস্কার বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক। 

বিশাল আকারের বাজেটের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মুসলিম চৌধুরী বলেন, প্রথমে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ ঘাটতি ধরে ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় এবং পরে সেই অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধানকে কেবল তার লক্ষ্যমাত্রা জানিয়ে দেওয়া হয় এবং তাকে তা অর্জন করতে বাধ্য করা হয়। এই প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বাস্তবসম্মত হিসাব করতে হবে বলে পরামর্শ দেন তিনি। 

মুসলিম চৌধুরীর মতে, সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিগুলো প্রমাণ-ভিত্তিক হতে হবে। বর্তমানে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১৭টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চলছে এবং এগুলোর প্রশাসনিক ব্যয় অত্যন্ত বেশি। অর্থায়নের বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এই ব্যয় কমাতে পারলে সামাজিক সুরক্ষার আওতা অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন মুসলিম চৌধুরী। 

দেশের সংস্কার কারা চায়, কারা বাধা দেয় এবং কোন সংস্কারগুলো সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হয় না- তা তদারকি করা দরকার বলে প্রয়োজন বলে মনে করেন সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। 
তিনি বলেন, সংস্কার অনেকের কাছে এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয় অথবা নাগরিক হিসেবে সংবাদপত্রে পড়া খবরের মতো, যেখানে মাঝে-মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন। 

বহু বছর আগে পরিকল্পনা পর্ষদে থাকাকালীন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সিপিডির চেয়ারম্যান বলেন, সংস্কারের জন্য কেবল আইন পাস করানোই মূল কাজ নয়, বরং সেটি বাস্তবায়ন করাই আসল চ্যালেঞ্জ। বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কোনো সংস্কার সফল হয়েছে কি না তার আসল পরিমাপ হলো তা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু সুফল দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পুলিশি সংস্কারের মাধ্যমে যদি জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয় যাতে থানায় সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়, তবে দুই বছর পর সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে দেখতে পারেন সেই সংস্কারটি আসলে কতটুকু কার্যকর হয়েছে। সেটিই হবে সংস্কারের প্রকৃত পরিমাপ। 

রেহমান সোবহান বলেন, বর্তমানে বিশ্ব ঋণ সংস্থা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে যেসব সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে এবং ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আসলে অনেক পুরোনো। অনেক বছর আগে থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে এগুলো বারবার নতুন করে সাজিয়ে সামনে আনা হয়েছে। ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য অনেক সময় দেশগুলো এই খেলায় অংশ নেয়। আবার এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও মূল লক্ষ্য থাকে অর্থ ছাড় করা, সংস্কারের প্রকৃত বাস্তবায়ন তাদের কাছে মুখ্য নয়।