রহমত রহমান, ঢাকা: দেশে অন্তত ১ কোটি ১৭ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৯২ হাজার। তাই ভ্যাটের আওতা ও আদায় বাড়াতে ট্রেড লাইসেন্সধারী সব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেই এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র মতে, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে আগামী বাজেট থেকে ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এতে বছরে অন্তত ৫০ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় চলে আসবে। এতে ভ্যাট খাতে স্বচ্ছতা ও আদায়- দুটিই বাড়বে। শুধু ট্রেড লাইসেন্স নয়, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (চলতি হিসাব) খোলার ক্ষেত্রেও ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সহজে শনাক্ত করা এবং সঠিকভাবে ভ্যাট ও আয়কর আদায় সম্ভব হবে।
মূলত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে দেশের প্রায় ২৯৫টি প্রধান ব্যবসার অধীনে ৪৯১ ধরনের ব্যবসা সিটি করপোরেশন আদর্শ কর তফসিল ২০১৬ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত রয়েছে।
বিসিএসের সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে অর্থনৈতিক ইউনিট বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে অন্তত অর্ধেক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। এসব ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ভ্যাট নিবন্ধন সনদ নামে পরিচিত বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) দাখিল বাধ্যতামূলক করা হলে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অর্ধকোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করে এনবিআর। আর ভ্যাট নিবন্ধিত হলে প্রতিষ্ঠানপ্রতি ২ হাজার টাকা করে ভ্যাট দিলে মাসে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হবে যা বছরে দাঁড়াবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ট্রেড লাইসেন্সধারী দোকানের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এর বাইরেও আরও অন্তত ১০ লাখ ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। ট্রেড লাইসেন্সধারী এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে অন্তত ২ হাজার টাকা করে ভ্যাট আসলে সরকার ভ্যাট পাবে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা যা বছরে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাজেট-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেলেও নানা ধরনের জটিলতার কারণে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা নিবন্ধন দিতে পারে না। ফলে অনিবন্ধিত এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ভ্যাট আদায় সম্ভব হয় না। ভ্যাট না দিলেও প্রতি বছর ট্রেড লাইসেন্স ঠিক-ই নবায়ন করতে হয়। সে জন্য আমরা ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে দিতে চাই। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েই নিবন্ধন নেবেন। আর নিবন্ধনের আওতায় এলে রাজস্ব কর্মকর্তারা তদারকির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ভ্যাট আদায় করতে পারবেন। তাতে বছরে অন্তত ৫০ লাখ নবায়ন হলেও আমরা ৫০ লাখ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান পেয়ে যাব।’
এনবিআর সূত্র মতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব (চলতি হিসাব) খোলার ক্ষেত্রেও ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় চলে আসবে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আয়কর বিভাগ গত কয়েক বাজেটে অন্তত ৪৫টি সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে এসব সেবাপ্রার্থী রিটার্ন দাখিল করতে বাধ্য হয়েছেন, রিটার্ন দাখিলের হারও বেড়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে এনবিআর আগামী বাজেটে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করতে চায়। এনবিআরের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন চলতি হিসাব খোলা বা বিদ্যমান চলতি হিসাব সচল রাখার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন যাচাই বাধ্যতামূলক হতে পারে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতায় আসবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকলে তা লুকানো হয়। ব্যাংকের সঙ্গে ভ্যাটের অনলাইন সংযোগের মাধ্যমে তাও বের করা সম্ভব হবে। বাজেটে বাধ্যতামূলক করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট নিবন্ধন নিতে আগ্রহী হবে। তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন যাচাই করা সহজ হবে। কারণ, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান প্রকৃত লেনদেন গোপনের মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে থাকে।


