প্রযুক্তি ডেস্ক: অ্যাথলেটিকস এবং রোবটিক্স প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হলো বেইজিং হাফ ম্যারাথন। রোববার অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় মানুষের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে একদল উন্নত হিউম্যানয়েড রোবট। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২১দশমিক ১ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ দৌড় প্রতিযোগিতায় রোবটগুলো তাদের যান্ত্রিক সক্ষমতা এবং গতির অভাবনীয় প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মূলত একটি প্রদর্শনীমূলক ক্যাটাগরিতে অংশ নিলেও রোবটগুলোর টাইমিং এবং পারফরম্যান্স অনেক পেশাদার অ্যাথলেটকেও বিস্মিত করেছে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ৫টি হিউম্যানয়েড রোবটকে মূলত তৈরি করা হয়েছে মানুষের শারীরিক গঠনের অনুকরণে। দৌড় শুরুর পর থেকেই রোবটগুলো তাদের প্রোগ্রামে সেট করা নির্দিষ্ট গতি বজায় রেখে ফিনিশিং লাইনের দিকে এগোতে থাকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষস্থানীয় রোবটটি ১ ঘণ্টা ৫ মিনিট সময়ের মধ্যে হাফ ম্যারাথন সম্পন্ন করেছে। উল্লেখ্য যে, এই গতি একজন পেশাদার আন্তর্জাতিকমানের ম্যারাথনারের গতির সঙ্গে সরাসরি তুলনীয়। রোবটগুলো কেবল দৌড় সম্পন্নই করেনি, বরং দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় তাদের যান্ত্রিক ভারসাম্য ছিল দেখার মতো।
চীনের শীর্ষস্থানীয় কিছু রোবটিক্স ল্যাবরেটরি এবং কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই রোবটগুলো তৈরি করা হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতার চিপসেট এবং রিয়েল-টাইম ব্যালেন্সিং অ্যালগরিদম। দৌড়ের সময় রাস্তার উচ্চতা, ঢাল এবং অন্যান্য অ্যাথলেটদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে রোবটগুলোতে বসানো ছিল লিডার এবং উচ্চমানের ক্যামেরা সেন্সর। গবেষকরা জানিয়েছেন, মানুষের মতো দুই পায়ে ভর করে দৌড়ানো অত্যন্ত জটিল একটি প্রকৌশল। কিন্তু এই রোবটগুলো কোনো রকম যান্ত্রিক ত্রুটি বা ভারসাম্য না হারিয়ে সফলভাবে দৌড় শেষ করার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, রোবটিক্স প্রযুক্তি এখন ল্যাবরেটরির বাইরে বাস্তব জগতের প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় সক্ষম।
ম্যারাথনে রোবটের এই অংশগ্রহণ ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অনেক অ্যাথলেট একে প্রযুক্তির বিজয় হিসেবে দেখলেও, কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, এটি অদূর ভবিষ্যতে ক্রীড়াঙ্গনের মানবিক আবেদনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে পেন্টাগন বা অন্যান্য সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ম্যারাথন আসলে রোবটের ‘স্ট্যামিনা’ বা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা ছিল। কারণ, সাধারণত হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর ব্যাটারি লাইফ এবং যান্ত্রিক ঘর্ষণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ২১ কিলোমিটারের এই পথ বিরতিহীনভাবে পাড়ি দেওয়া সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেইজিংয়ের এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। যদি রোবটগুলো মানুষের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, দ্রুত সরবরাহ সেবা এবং এমনকি ব্যক্তিগত সহকারীর কাজেও এদের ব্যবহার অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে। ক্রীড়াঙ্গনের ক্ষেত্রে, রোবটগুলো এখন থেকে অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পেস-সেটিং বা নির্দিষ্ট গতি বজায় রেখে দৌড়ানোর অভ্যাসে রোবটগুলো নিখুঁত টাইমিং নিশ্চিত করতে পারবে।
পেশাদার অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনগুলো এখন থেকেই ভাবছে যে, ভবিষ্যতে রোবট এবং মানুষের জন্য আলাদা নীতিমালা থাকা প্রয়োজন কি না। মানুষের পেশির ক্ষমতার বিপরীতে একটি ইলেকট্রিক মোটরের শক্তিকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া জনাকীর্ণ ম্যারাথনে একটি যান্ত্রিক রোবট কোনো মানুষের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না, সেই বিষয়েও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বেইজিংয়ের আয়োজকরা অবশ্য জানিয়েছেন, এই ম্যারাথনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং রোবটগুলো তাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে শতভাগ সফল হয়েছে।
বেইজিং হাফ ম্যারাথনে রোবটদের এই উপস্থিতি কেবল একটি একক ইভেন্ট নয়, বরং এটি আগামীর পৃথিবীর এক নতুন বাস্তবতা। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে মানুষ এবং যন্ত্রের মধ্যকার সীমানা কমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। অ্যাথলেটিকসের মাঠে রোবটের এই বিচরণ যেমন বিস্ময়কর, তেমনি এটি আমাদের সামনে নতুন নতুন প্রযুক্তিগত ও নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। বেইজিংয়ের এই ম্যারাথন সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে রোবটিক্স বিজ্ঞানে যে নতুন মাত্রা যোগ হলো, তা আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ মানুষকে কেবল চ্যালেঞ্জই জানাচ্ছে না, বরং সহাবস্থানের এক নতুন পথও দেখিয়ে দিচ্ছে।


