বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়ছে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে টানা সাত সপ্তাহের যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাব আগামী সপ্তাহ থেকে স্পষ্ট হতে পারে। বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক জরিপের দ্বিতীয় দফা তথ্য প্রকাশের পর এই প্রভাব আরও পরিষ্কার হবে বলে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম মাসে যে প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও বাড়তি মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল, দ্বিতীয় মাসে তা আরও বেড়েছে কি না—সেটিই এখন মূল বিষয়।

অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র—বিভিন্ন দেশের চলতি মাসের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) আগামী বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হবে। ব্লুমবার্গের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জার্মানি, ফ্রান্স, ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যে এই সূচকের অবনতি হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সূচকগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে। ইউরোপে এ সপ্তাহে ফ্রান্সের ব্যবসায় আস্থা সূচক এবং জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ ইফো ব্যবসায় পরিবেশ সূচক প্রকাশিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হবে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা আস্থা সূচক।

এই তথ্যগুলো থেকে শেষ পর্যন্ত বোঝা যেতে পারে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ কতটা ঘনিয়ে আসছে। ১৯৭০–এর দশকের মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থবির প্রবৃদ্ধির মিশ্রণকে বোঝাতে ব্যবহৃত এই শব্দটি সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিস উইলিয়ামসন মার্চে বৈশ্বিক সূচক বিশ্লেষণে এই ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন।

এর আগে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানায়, বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় মন্দার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ক্ষত সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে না।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘যুদ্ধ আগামীকাল শেষ হলেও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্থায়ীভাবে পড়ে গেছে।’

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও নীতিনির্ধারকরা এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফিলিপ লেন জানান, সুদহার নির্ধারণে তারা এসব জরিপের তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে পর্যাপ্ত জরিপ তথ্য থাকবে। তবে যারা এসব জরিপে অংশ নিচ্ছেন, তারাও একই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি রয়েছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সামগ্রিক বিক্রি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গাড়ি ও জ্বালানি বাদ দিলে ভোক্তাদের ব্যয় কিছুটা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলতে পারে। এপ্রিলের প্রাথমিক পিএমআই এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা আস্থা সূচক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশদ ধারণা দেবে। কানাডায় মার্চে মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে চীনে ঋণের সুদের হার অপরিবর্তিত থাকতে পারে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড, জাপান, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বাণিজ্য তথ্য বৈশ্বিক চাহিদার প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরবে। সিঙ্গাপুর, হংকং ও জাপানের মূল্যস্ফীতির তথ্য থেকে বোঝা যাবে জ্বালানির উচ্চমূল্য ভোক্তা পর্যায়ে কতটা প্রভাব ফেলছে। ফিলিপাইনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ায় ভোক্তা আস্থা সূচক নজর কাড়বে।

যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হবে। মার্চে মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ইউরোজোনে ক্রিস্টিনা লাগার্দেসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা অর্থনীতি নিয়ে বক্তব্য দেবেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়তে পারে। তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার অপরিবর্তিত রাখতে পারে, যদিও কয়েকজন অর্থনীতিবিদ সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও দেখছেন।

লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কলম্বিয়ায় প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকতে পারে। আর্জেন্টিনায় জ্বালানি ও খনিজ খাত ভালো করলেও নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। মেক্সিকোতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের তথ্য মন্দার শঙ্কা পুরোপুরি দূর করতে নাও পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও নীতি নির্ধারকদের জন্য মাথাব্যথা হয়ে থাকবে।