মারিয়ানা মাজুকাটো: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই যুদ্ধের কারণে ব্যাপক মানবিক ও পরিবেশগত ক্ষতিসাধন হচ্ছে। তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা করছে যা ইতিহাসে এমন খুবই কম হয়েছে। এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে। সরকারি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। তাই নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই বুঝতে হবে, এই ধরনের জ্বালানি সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদি সংকট নয়। এটি আমাদের নতুন বাস্তবতা।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য শুধু আমাদের ব্যবহৃত শক্তির ধরনই নয়, বরং কীভাবে, কোথায় এবং কাদের দ্বারা পণ্য উৎপাদিত হয়, তাতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। একটি লক্ষ্য-ভিত্তিক সবুজ শিল্প কৌশল এবং সরকারি বিনিয়োগ সমর্থনকারী সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সরকার জীবনযাত্রার মান সুরক্ষিত করতে পারে। এভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই চাপ থেকে রক্ষা করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলো অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। যদি কোনো নীতি কেবল জীবাশ্ম জ্বালানির মুনাফাকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে, তবে সেটিকে ব্যর্থ বলে গণ্য করা উচিত।
এখন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সময়। ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি সংকট আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। এখন তারা তা কার্যকর করেছে। ফলে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এ-ই প্রথম অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
চার বছর আগে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং সংরক্ষণের অভাবে পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশ যুক্তরাজ্য। আকস্মিক সরবরাহ সংকটের উচ্চঝুঁকি যেকোনো দেশের জন্যই বড় সতর্কবার্তা। বিদ্যুৎ গ্রিডকে কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি সচিব এড মিলিব্যান্ড তার ‘ক্লিন পাওয়ার’ মিশনকে এগিয়ে নিতে অগ্রগতি করলেও গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যের মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাজ্যে পাইকারি জ্বালানির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি অনুসরণ করলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করা উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য একটি ভুল হবে। যুক্তরাজ্যসহ অন্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো আরও সুরক্ষিত হবে, যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিবেশবান্ধব ও দেশীয় উৎস থেকে আসে। এছাড়া গ্রিডের বাইরে গিয়ে আমাদের চলাচল, নির্মাণ ও জীবনযাত্রার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে।
এই উদ্দেশ্য সফল করতে আবাসন, পরিবহন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অর্থায়ন তত্ত্বাবধানকারী সরকারি বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারি কর্মপরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের অনুসরণের জন্য একটি সুস্পষ্ট ‘মুন সট’ লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। কারণ এভাবেই প্রয়োজনীয় আন্তঃখাতের বিনিয়োগ সংহত করা যায়।
বর্তমানে এই জ্বালানি ধাক্কার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট পুনরায় প্রবল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যে ‘অফিস ফর বাজেট রেসপন্সিবিলিটি’র এই বছর মুদ্রাস্ফীতি ৩ দশমিক ৪ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস ইতোমধ্যেই ব্যাহত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী রাচেল রিভস পরিবারগুলোকে দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করার জন্য বেশি চাপের মধ্যে রয়েছেন। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের ভোক্তা মূল্য ৯ শতাংশ বৃদ্ধির পেয়েছিল। যার অর্ধেকই ছিল খাদ্য ও জ্বালানির জন্য। ভূ-রাজনৈতিক হুমকি এবং জলবায়ু পরিবর্তন তীব্রতর হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়াও ২০২২-২৩ সালের মুদ্রাস্ফীতির প্রধান উৎস যে করপোরেট মুনাফা ছিল তা দেখানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। জ্বালানি সংকট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছিল। শুধুমাত্র এই কারণে যে তাদের কাছে এটা দুষ্প্রাপ্য সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই কারণে নয় যে তারা হঠাৎ করে উৎপাদন করে লাভ করেছিল। সরকারের সঠিক ভূমিকা নিতে হবে যে, সংকট যেন অন্য সবার স্বার্থের বিনিময়ে শেয়ারহোল্ডারদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর সুবিধা করে না দেয়। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সংকটগুলো প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরকে চালিত করার সুযোগ করে দিতে হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং রিভস অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের বিরুদ্ধে ‘শূন্য-সহনশীলতা’ নীতি ঘোষণা করেছেন। এতে শীর্ষস্থানীয় গ্যাসোলিন বিক্রেতারা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই ধরনের নীতির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের ২০২২-২৩ সালের ‘এনার্জি প্রাইস গ্যারান্টি’ কার্যকরভাবে সরবরাহকারীদের ভর্তুকি দিয়ে এবং অপ্রত্যাশিত মুনাফার ওপর কর আরোপের চেষ্টা করে করেছিল এবং প্রদেয় মূল্যের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। স্পেন এবং পর্তুগাল বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের খরচের ওপর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে। ফলে উৎসস্থলেই অপ্রত্যাশিত মুনাফার হার হ্রাস পেয়েছে।
এই দ্বিতীয় পন্থাটি একটি উচ্চাভিলাষী নবায়নযোগ্য-শক্তি সম্প্রসারণের সঙ্গে মিলিত হয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হয়েছে। ২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের বিদ্যুতের দাম ইউরোপের গড় দামের চেয়ে ৫৭ শতাংশ কম ছিল। স্পেনে এখন ব্যয়বহুল গ্যাস মাত্র ১৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করেছে, যেখানে ইতালিতে এই হার ৮৯ শতাংশ। যদি লক্ষ্য হয় টেকসই প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা, সেক্ষেত্রে একচেটিয়া মুনাফা জমা করে পরে তা করের মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টা না করে ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা শ্রেয়।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব সমগ্র অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ উৎপাদন, পরিবহন এবং কৃষিক্ষেত্রে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার যা বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার। সুদের হার বৃদ্ধি হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হোবে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অর্থায়নও অন্তর্ভুক্ত যা উচ্চ খরচের বিষয়। এতে ব্যয় আরও বাড়বে। অথচ মুদ্রাস্ফীতির সরবরাহের উৎসগুলো মোকাবিলায় এটি কোনো ভূমিকা রাখে না।
আরেকটি খারাপ দিক হলো, বিনিয়োগকারীরা এই প্রবণতাগুলোকে আমলে নেওয়ায় সার্বভৌম ঋণের হার আরও বেড়ে যাবে। এতে স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোতে সরকারি বিনিয়োগকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে। এই নিম্নমুখী চক্র রোধ করতে, সরকারকে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। মুদ্রাস্ফীতির উৎস থেকেই এর মোকাবিলা শুরু করতে হবে।
সৌভাগ্যবশত, পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের পাশাপাশি এর পরোক্ষ প্রভাবের ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। বেশি কর্মসংস্থান তৈরি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। এই সুবিধাগুলো গণনা করলেই এর খরচ উঠে আসে। গত সপ্তাহেই যুক্তরাজ্যের স্বাধীন জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, নেট-জিরো নির্গমনের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য ব্যয় করা প্রতিটি পাউন্ড প্রায় ২ থেকে ৪ পাউন্ডের সমমূল্য তৈরি করে। এতে পরিচ্ছন্ন বায়ু, উষ্ণতর ঘর এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মতো সুবিধাও পাওয়া যায়।
এই জ্বালানি সংকট উদ্যোক্তা রাষ্ট্রগুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করতে হবে। সুযোগসন্ধানী মুনাফাবাজি প্রতিরোধ করতে হবে। শিল্প রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা, সরঞ্জাম ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এখন উত্তম মুহূর্ত। প্রায় এক শতাব্দী আগে জন মেনার্ড কেইনস উল্লেখ করেছিলেন, যখন বেসরকারি খাত ও ভোক্তার আস্থা স্থবির হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকেই দিকনির্দেশনা ও বিনিয়োগ প্রদান করতে হয়। সরকারগুলোকে অবশ্যই এই বড় ধাক্কায় নিজেদের পঙ্গু হতে দেওয়া যাবে না। মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
- লেখক: ইতালিয়ান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ এবং অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

