পদ্মার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে পড়ে ডুবে গেছে রাজধানীগামী একটি আন্তঃজেলা বাস। সঙ্গে ডুবে গেছে কমপক্ষে ২৬টি জীবন। এভাবে অবহেলায় আরও কত প্রাণ যে অন্ধকার জলের নিচে চিরতরে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব এখনও জানা যায়নি। গত ২৫ মার্চ বিকাল ৫টার দিকে যখন সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পদ্মায় তলিয়ে গেল, তখন সেই বাসে ছিলেন সাধারণ মানুষ- কেউ বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ হয়তো প্রিয়জনের কাছে যাচ্ছিলেন, কেউ হয়তো কোনো স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথে নেমেছিলেন। নিরপরাধ মানুষগুলোর এই মৃত্যু কোনো হয়তো অনিবার্য দুর্ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা আর দায়িত্বহীনতার অনিবার্য পরিণতি।
কোনো বাসযাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছেন কিন্তু তার স্ত্রী ও শিশুসন্তান এখনও নিখোঁজ। একজন মানুষ প্রাণে বেঁচে থেকেও প্রতি মুহূর্তে মরছেন, কারণ যাদের নিয়ে বাঁচার কথা, তারা পদ্মার অতলে। এই একটি পরিবারের অসহনীয় বিপর্যয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার চিত্র। বাসের ভেতর থেকে ভেসে ওঠা লাগেজ, জুতা-স্যান্ডেল, ভ্যানিটি ব্যাগের মতো ছোট জিনিসগুলো নিছক বস্তু নয়, এগুলো মানুষের জীবনের চিহ্ন, স্বপ্নের টুকরো। যে শিশুর প্রিয় ব্যাগটি পদ্মার বুকে ভেসে উঠেছে, তার কথা ভাবলে বুক ভারী হয়ে আসে। সেই শিশুকে রক্ষা করার দায় ছিল রাষ্ট্রের। প্রশ্ন হলো, মর্মন্তুদ দুর্ঘটনার দায় কার?
দৌলতদিয়া-পাটিুরিয়া ফেরিঘাট বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌ-পারাপার পথ। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এবং শত শত যানবাহন এই পথে পদ্মা পার হয়। এই ঘাটের পন্টুনে ভারী যানবাহন পারাপারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা হয়, সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পন্টুনে যদি যথাযথ রেলিং, সংকেতব্যবস্থা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থাকত, তাহলে কি এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো না? নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কাঠামোগত নিরীক্ষা কি আদৌ হয়? নাকি কাগজে-কলমে দায়িত্ব পালনের আড়ালে বাস্তবে চলে দীর্ঘ অযত্ন?
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো উদ্ধারকাজে বিলম্ব। প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন, উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলও প্রায় এক ঘণ্টা পরে উদ্ধার কাজ শুরু করেছে। একটি ডুবন্ত বাসে আটকে পড়া মানুষ বাঁচাতে প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড অমূল্য। সেই জরুরি সময়ে যদি উদ্ধারকারীরা বিলম্ব করেন, তাহলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে যায়। এই দেরির জন্য কে দায়ী? কোন প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা সমন্বয়হীনতা মানুষের জীবন কেড়ে নিল, সেই প্রশ্নের উত্তর তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু সংশয়ও আছে গভীর। বাংলাদেশে বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। রিপোর্ট জমা পড়ে, ফাইল বন্ধ হয়, দায়ীরা পার পেয়ে যায়, আর একই ঘটনা ঘুরে ঘুরে আসে নতুন ঠিকানায়। এবার যদি সত্যিই জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে এই ২৬টি মৃত্যু শুধু সংখ্যা হয়েই থাকবে- ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হবে আরও একটি ভুলে যাওয়া ট্র্যাজেডি।
আমরা স্পষ্টভাবে দাবি করছি, তদন্ত হোক নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে। দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যে-ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। দেশের সব ফেরিঘাটের পন্টুন, সংযোগ সড়ক ও যানবাহন পারাপার কাঠামো জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা করা হোক। নদীপথে উদ্ধার সক্ষমতা এবং দ্রুত সাড়াদান ব্যবস্থা আমূল ঢেলে সাজানো হোক। প্রয়োজনে উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক উদ্ধারকারী জাহাজ ও সরঞ্জাম এনে সক্ষমতা বাড়ানো হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। পরবর্তী সময় যে কোনো দুর্ঘটনায় যেন দীর্ঘ সময় উদ্ধারকার্যের জন্য অপেক্ষা না করতে হয়।
নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা। তাদের শোক ব্যক্তিগত, কিন্তু এই ব্যর্থতা সামষ্টিক। পদ্মার পানি গড়িয়ে যাবে প্রতি মুহূর্তে- কিন্তু যারা চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তারা আর ফিরবেন না। অন্তত যারা বেঁচে আছেন, তাদের জন্য নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। রাষ্ট্র সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে— এটাই সব নাগরিকের প্রত্যাশা।

