যুদ্ধ-পরিস্থিতির চলমান সংঘাতে বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়েই চলছে। কৃষি উৎপাদনে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। বাংলাদেশে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে বলে সরকার দাবি করছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তার যথার্থ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সরবরাহ সংকট দেখিয়ে কৃষকদের কাছে বাড়তি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সারের ধরনভেদে কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিতে হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা রসিদ ছাড়া বাড়তি দামে সার বিক্রি করছেন। এতে ভর্তুকির সুফল পুরোটা কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, ডিলারদের পকেটে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সরকারের নজরদারির অভাবে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার ও অভিযান চালানো দরকার।
ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কৃষক পর্যায়ে এই সারগুলোর দাম নির্ধারিত হলেও সেই দামে কৃষক পাচ্ছেন না। সরকার কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সারের দাম ২৭ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ২৭ টাকার টিএসপি সার বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৭ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া ২১ টাকা মূল্যের ডিএপি ৩১ এবং ২০ টাকার এমওপি সার সর্বোচ্চ ২৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার সারে ভর্তুকি দেয়। সারের জোগান ঠিক রাখতে সরাসরি আমদানি এবং তদারকিও করে সরকার। কারণ সারের সরবরাহ বা মূল্য পরিস্থিতিতে কোনো সংকট তৈরি হলে তা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। কৃষকরা বলছেন আলুর মৌসুম থেকেই টিএসপি ও ডিএপি সার ডিলারদের কাছে পাওয়া যায়নি। পরে বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে হয়েছে। এই দাম ছিল সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। কিছু কিছু ডিলার দোকানে মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখলেও সেই অনুযায়ী বিক্রি করছেন না। এমনকি কেউ কেউ তালিকায় সারের মূল্য লিখছেন না। বিক্রেতারা সরকারি দরের রসিদ দিলেও বাড়তি দরের রসিদ দিচ্ছেন না। এতে কোনো নজরদারি হচ্ছে না।
দেশের চলমান বোরো মৌসুম ও আসন্ন রবি মৌসুমে উচ্চফলনের জন্য প্রয়োজন নির্বিঘ্ন সার সরবরাহ। দেশে সবচেয়ে বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় এ সময়ে। আশঙ্কা রয়েছে সারের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকার কারণে খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি আসতে পারে। এ ঝুঁকি এড়াতে সরকারের প্রাধান্য দেওয়া উচিত সারের মজুদ বাড়ানোয় এবং অব্যাহতভাবে পণ্যটির সরবরাহ নিশ্চিত করা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের সরকারি গুদামগুলোয় সারের মজুদ আছে প্রায় ১৮ লাখ টন। যেখানে দেশের চলতি অর্থবছরে সারের মোট সম্ভাব্য চাহিদা ৬৯ লাখ টন। সারের বাড়তি চাহিদা মেটাতে অবশ্যই উৎপাদন ও আমদানি বাড়াতে হবে। দেশে কৃষি চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদনে মোট রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার হয় শুধু বোরো ও রবি মৌসুমে। এরই মধ্যে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে গ্যাসের অভাবে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার সংগ্রহ করে অন্তত ৬০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার পরও কেন কৃষকের কাছে ইউরিয়া পৌঁছাচ্ছে না সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সমস্যা হলো সরকার দাম নির্ধারণ করলেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ শৃঙ্খলের বেহাল দেখে বস্তাপ্রতি সারের দাম বাড়াচ্ছে। এগুলোও কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। বাজারে সার নিয়ে যারা অপতৎরতা চালায় তাদের প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষদের উদাসীনতা কৃষি উৎপাদনে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা যেন উৎপাদন মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ পান এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

