গত এক দশকে দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাত যে গতিতে এগিয়েছে তাতে কোটি কোটি টন পাথর একত্রিত করার প্রয়োজন হয়েছে। বাস্তবতা হলো এ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে বাংলাদেশকে ভারত ও ভুটান থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর আমদানি করতে হয়। গত ২০ বছরে আমদানির কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারত, বিশেষ করে মেঘালয় ও আসাম অঞ্চল থেকে আসা পাথর। ভুটান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ভারত ও ভুটান ছাড়াও চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম থেকে কিছু পাথর আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের উন্নয়নের বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে আঞ্চলিক আমদানির ওপর।
কিন্তু এই আমদানির পেছনে কেবল চাহিদা নয়, একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটও কাজ করে। সীমান্তঘেঁষা আমদানিকারক চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার দেশীয় খনির সম্প্রসারণে ততটা মনোযোগ না দিয়ে আমদানিকে কার্যত উৎসাহিত করেছে নিম্ন শুল্ক কাঠামো, সহজ প্রবেশাধিকার ও নীতিগত বাধ্যবাধকতার অভাবে বিদেশি পাথর বাজারে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এতে লাভবান হয়েছে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী; কিন্তু দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদ রয়ে গেছে অব্যবহৃত, আর বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে গেছে দেশের বাইরে।
‘অবিক্রীত ১৫ লাখ টন পাথর নিয়ে বিপাকে মধ্যপাড়া’ শীর্ষক সংবাদ গতকাল জাতীয় অর্থনীতিতে প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদে বলা হয়েছে, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা, বিভিন্ন প্রজেক্টে এলওসি চুক্তির অধীনে ভারত থেকে পাথর আমদানি এবং মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ক্রয় হ্রাসের ফলশ্রুতিতে খনির ২৫টি স্ট্যাক ইয়ার্ডে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, নতুন করে উৎপাদিত পাথর রাখার জায়গা না থাকায় অচিরেই খনির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি কেবল একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং এটি দেশের নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা, পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। মধ্যপাড়া খনির প্রধান ক্রেতা হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পাউবোর মতো সরকারি সংস্থা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রেলপথ নির্মাণ কিংবা নদীশাসনের কাজে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করছে না। উল্টো বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে আমদানিকৃত পাথরের ব্যবহার বেড়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ পাথরের মজুদ ব্যবহার ঠিকমতো না করে বিদেশি নির্ভরতার সমস্যার মূল আসলে সম্পদের অভাব নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ও পরিকল্পনাগত ঘাটতি। মধ্যপাড়ার মতো সমৃদ্ধ খনি থাকা সত্ত্বেও সময়মতো উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হয়নি, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়নি। মধ্যপাড়া থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত রেলভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগও পর্যাপ্ত নেই, ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে দেশীয় পাথর প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে দেশীয় পাথর ব্যবহারের কোনো বাধ্যতামূলক নীতি না থাকায় ঠিকাদারেরা সহজলভ্য আমদানিকৃত উৎসের দিকে ঝুঁকেছে। এর ওপর আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর নিরুৎসাহ করে এমন শুল্ক কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফলে একটি সমন্বিত শিল্পনীতি না থাকায় দেশীয় সম্পদ ব্যবহার না করে আমদানিনির্ভর একটি কাঠামোই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাই এখন প্রয়োজন একটি সুসংহত নীতি ধাপে ধাপে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ দেশীয় পাথর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, বিদ্যমান স্টক দ্রুত বাজারজাত করা। এতে সরকার নিয়ন্ত্রক ও রাজস্ব সংগ্রাহক হিসেবে লাভবান হবে, বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা আনবে, আর দেশ পাবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিরাপত্তা। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে আমদানি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন গতি সৃষ্টি হবে ও সরকার স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ পাবে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পাথর সরবরাহের সক্ষমতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে, প্রয়োজন শুধু সঠিক বিপণন, নীতিগত সহায়তা ও চাহিদা নিশ্চিত করা। তাই আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি।

