ইবাদতে ইহসানের ভূমিকা

ইহসান একটি ব্যাপক শব্দ, যার অক্ষরে অক্ষরে মহত্ত্ব ও উচ্চতার অর্থ নিহিত। ইসলামে এটি কোনো ঐচ্ছিক গুণ নয় যা কেউ ইচ্ছা করলে গ্রহণ করবে আর ইচ্ছা করলে ছেড়ে দেবে; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন যা ইবাদত, কর্ম, আচরণ, নির্মাণ ও সৃজনশীলতাকে পরিব্যাপ্ত করে।

কোরআন ও সুন্নাহে ইহসানের ধারণা: জিবরাইল আলাইহিস সালাম যখন ইহসান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন নবী (সা.) একটি পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা প্রদান করলেন: ‘ইহসান হলো, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহিহ বোখারি ও মুসলিম) এই সংজ্ঞা প্রকাশ করে যে ইহসানের মূলে রয়েছে আল্লাহর প্রতি সার্বক্ষণিক সচেতনতা, যা এর ধারককে প্রতিটি কাজে সর্বোচ্চ সাধ্য ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তায়ালা একাধিক আয়াতে ইহসানের নির্দেশ দিয়েছেন, ইরশাদ হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও ইহসানের নির্দেশ দেন।’ (সুরা আন-নাহল, ১৬: ৯০) এবং আরও ইরশাদ হয়েছে: ‘এবং তোমরা ইহসান কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন’ (সুরা আল বাকারা- ২: ১৯৫)— যা প্রমাণ করে যে ইহসান একটি ঐশী দাবি, নিছক নৈতিক পরামর্শ নয়।

ইবাদতে ইহসান এবং সভ্য মানুষ গঠনে এর ভূমিকা: কোনো প্রকৃত সভ্যতাই একজন সৎ ও ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, আর ইবাদতে ইহসান হলো এই মানুষ গঠনের প্রথম স্তর। যে মুসলিম আল্লাহর ইবাদত করে যেন সে তাঁকে দেখছে, সে সততা ও কর্মে আন্তরিকতার ওপর প্রতিপালিত হয়— যে গুণগুলো সভ্যতা নির্মাণে অপরিহার্য। এই ইবাদতি ইহসান এমন প্রজন্মের জ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের জন্ম দিয়েছিল যারা জ্ঞান অন্বেষণ ও কারিগরিতে দক্ষতা অর্জনকে এমন একটি ইবাদত হিসেবে দেখতেন যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার প্রত্যাশা করতেন। এভাবে তারা চিন্তা ও স্থাপত্যের যে বিস্ময়কর কীর্তি রচনা করেছিল, তা আজকের বিশ্ব বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল।

কর্ম ও শিল্পে ইহসান: অগ্রগতির ভিত্তিস্তম্ভ ইহসানের আরেকটি প্রচলিত অর্থ হচ্ছে ‘উৎকর্ষ’। নবী (সা.) কর্মে উৎকর্ষতার নির্দেশ দিয়েছেন সুস্পষ্টভাবে, যখন তিনি বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজ করবে, সে যাতে তা উৎকর্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে।’- (সহিহ মুসলিম) এই মহান নববী নির্দেশই মুসলিম কারিগর, নির্মাতা, চিকিৎসক ও দার্শনিকদের নিছক পেশাদার থেকে রূপান্তরিত করেছিল এমন সৃজনশীল মানুষে, যারা তাদের প্রতিটি কর্মে পরিপূর্ণতার দিকে ধাবিত হতো। মসজিদ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং বিভিন্ন জাতির বিজ্ঞানের অনুবাদ ও উন্নয়ন— এসব কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল না; এর মূলে ছিল কর্মে ইহসানের নীতির বাস্তব প্রতিফলন।

আচরণে ইহসান: সভ্য সমাজের বুনিয়াদ

সামাজিক সংহতির অনুপস্থিতিতে কোনো সভ্যতা দাঁড়াতে পারে না, আর মানুষের সঙ্গে আচরণে ইহসান হলো সেই সংহতির মেরুদণ্ড। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: ‘এবং পিতা-মাতার সঙ্গে ইহসান কর এবং আত্মীয়, ইয়াতিম ও মিসকিনদের সঙ্গে।’ (সুরা আল বাকারা, ২: ১৯৫)— এভাবে ইহসানকে পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। এই কোরআনি দিকনির্দেশনা সংহতি, সহযোগিতা ও উদারতার এক সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, যা তার সোনালি যুগে ইসলামি সমাজকে সহাবস্থান ও দানশীলতার এক অনন্য আদর্শে পরিণত করেছিল। যেখানে আচরণে ইহসান প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে দ্বন্দ্ব হ্রাস পায় এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিধি বিস্তৃত হয়— যা যেকোনো প্রকৃত সভ্যতার নবজাগরণের জন্য অপরিহার্য শর্ত।

ইহসান সভ্যতার বাইরে থেকে যুক্ত কোনো অলঙ্কার নয়; এটি সভ্যতার প্রকৃত সত্তা এবং তার গভীরতম চালিকাশক্তি। যখন মুসলিমরা তাদের প্রতিপালকের বাণী ‘এবং তোমরা ইহসান করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসে।’ (সুরা আল মায়েদা, ৫: ৯৩)— সত্যিকার অর্থে অন্তরে ধারণ করেছিল, তখন তারা এমন একটি সভ্যতা রচনা করেছিল যা একের পর এক শতাব্দী ধরে পৃথিবীকে আলোকিত করেছে। এই যুগে, যখন উম্মাহ তার হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় রত, ইবাদতে, কর্মে ও আচরণে ইহসান— এটিই সেই প্রথম বীজ যা ছাড়া কোনো নবজাগরণ অঙ্কুরিত হতে পারে না। ইহসানের কল্যাণেই আমরা পেতে পারি নববী যুগের মতো অপরাধমুক্ত সমাজ এবং ইসলামের সোনালি অতীতের মতো জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি।

শাহেদ হারুন

ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক