প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কাজের সুযোগ কমেছে শিল্প-সেবা খাতে
  • মোট নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৩ শতাংশ কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে
  • উৎপাদন খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে ৩৫ শতাংশ 
  • বড় বিনিয়োগ ছাড়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: গত এক দশকে বাংলাদেশের শিল্প ও সেবা খাতে যতটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সে হিসেবে এ দুই খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। তবে এ সময়ে কৃষি খাতে কাজের সুযোগ বেড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান। মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ১ শতাংশ বাড়লে কর্মসংস্থান কত শতাংশ বাড়ে (কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা) তা গবেষণায় দেখানো হয়েছে।

ফলাফলে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৭ সময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা শূন্য দশমিক ২৫ পয়েন্ট ঋণাত্মক ছিল। এটি ২০১৭ থেকে ২০২৪ সময়ে বেড়ে শূন্য দশমিক ৯৮ পয়েন্ট হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি খাতে জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে বেশি চাকরি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শিল্প খাতে এটি শূন্য দশমিক ৩৩ পয়েন্ট থেকে কমে শূন্য দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্ট ঋণাত্মক হয়েছে। সেবা খাতেও কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা প্রায় অর্ধেক কমেছে। 

প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে নাজমুস সাদাত খান বলেন, বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গত প্রায় এক দশকে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। এই সময়ে কৃষি খাতে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যা আদর্শ প্রবণতা নয়। আসলেই কৃষি খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, নাকি অন্য খাতে কাজ না পেয়ে মানুষ কম আয়ের (কৃষিতে) অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, সেটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন। 

গত এক দশকে মোট নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৩ শতাংশ কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ সাধারণত কম আয়ের এবং অনানুষ্ঠানিক হয়। কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যবস্থাপক মর্যাদা ও পেশাজীবী শ্রেণিতে কর্মসংস্থানের হার ১০ শতাংশের নিচে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করে কৃষি খাতের এই ধরনের কাজে যোগ দিতে চান না। এটি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। 

মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে সানেমের আয়োজনের তিন দিনের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল। এ দিন বেশ কয়েকটি অধিবেশনে আলোচনা হয়। এর মধ্যে শ্রমবাজারের রূপান্তর নিয়ে আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। আলোচক ছিলেন সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন।   

এই অধিবেশনে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চালিকা শক্তি নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের গবেষণা সহযোগী দীপা দাস। তিনি বলেন, উৎপাদন খাতে মোট কর্মসংস্থান যেমন কমছে, তেমনি নারীর অংশগ্রহণও দ্রুত কমছে। যেমন, তৈরি পোশাক খাতে আগে যেখানে প্রায় অর্ধেক কর্মী নারী ছিলেন, এখন তা প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, শিশুসেবা ও সাংস্কৃতিক কারণ থাকতে পারে। 

সম্মেলনের প্লেনারি সেশনে ‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন’ নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম। এতে সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. রওনক জাহান। উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ গবেষক মির্জা এম হাসান। 

প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় অগ্রাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব। চলতি জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশ থাকবে। সেক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। 

জিডিপি বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করেন কাজী মারুফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়া দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব নয়। আর সরকার এই মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ করবে না। আমাদের প্রচুর বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে বড়ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকার বড় ধরনের কোনো প্রকল্পও হাতে নেবে না।