ঋণ ছাড়ে আইএমএফের মনোভাব ইতিবাচক
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের কয়েকটি কিস্তি ছাড় করা হয়েছে। তবে পরবর্তী কিস্তিগুলোর অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পূরণ এবং সংস্কারের বিষয় নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : ঋণ চুক্তির বাকি অর্থ ছাড়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মনোভাব ইতিবাচক বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মনোভাব বেশ ইতিবাচক।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখনও আলোচনা চলছে। আলোচনার মধ্যে যেগুলো এখনও রিজলভড (মীমাংসা) হয়নি, সেসব সমাধান হবে।’ বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এরই মধ্যে ঋণের কয়েকটি কিস্তি ছাড় করা হয়েছে। তবে পরবর্তী কিস্তিগুলোর অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পূরণ এবং সংস্কারের বিষয় নিয়ে
সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাজারে অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চলমান অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংস্কারে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় অর্থমন্ত্রীর। জবাবে আমীর খসরু বলেন, ‘আইএমএফ না করেছে কি না- এটা তো তারা বলতে পারবে।...আমি কীভাবে (উত্তর) দেব? আমি তো জানি এই ধরনের কোনো আলোচনা... ওই জায়গায় তো আমরা যাইনি।’
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘আমি তো মনে করি এখনও আলোচনা চলছে। সামনের দিকে যেগুলো এখনও রিজলভড হয়নি, সেগুলো আলোচনার মধ্যে আসবে। এটাই পরিষ্কার সিদ্ধান্ত। এখানে হ্যাঁ, না বলার তো সুযোগ নেই। আর এটা বুঝতে হবে, বিষয়গুলো একটা চলমান প্রক্রিয়া। এটা এক দিনের সিদ্ধান্ত না, এক ঘণ্টার সিদ্ধান্ত না। এটা চলতেই থাকবে, আলোচনা— ১৫ দিন পরেও চলবে। চলতে থাকবে। তো এগুলো ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস। চলতে থাকবে।’ আমীর খসরু বলেন, ‘এর মধ্যে সমাধান হবে। এর মধ্যে আমাদের কাজও চলতে থাকবে।’

এক সাংবাদিক জানতে চান, ঋণের বাকি কিস্তিগুলোর অর্থ ছাড় হবে তো? হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবার মধ্যে পজিটিভিটিই দেখছি।’ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভা চলছে। সেখানে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিচ্ছে।

এর মধ্যেই খবর আসে, রাজস্ব খাত ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সংস্থাটির শর্ত পূরণ না হওয়ায় পরবর্তী কিস্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে নতুন কর্মসূচির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে নতুন কোনো আরও কঠোর শর্তের বেড়াজালে পড়ার শঙ্কার কথা তুলে ধরেছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। তবে বসন্তকালীন সভার চতুর্থ দিনে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অর্থায়ন ও ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে খুবই ইতিবাচক মনোভাবে রয়েছে।’

তবে ঋণ কর্মসূচির আওতায় তারা কত অর্থ ছাড় করবে বা কী শর্ত দেবে, সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সবার অ্যাটিটিউড এখানে খুবই পজিটিভ- এক কথায় বলতে গেলে। তবে প্যাকেজটা কী হবে, সেটা অপেক্ষা করতে হবে। সেটা তো এখন আমি বলতে পারব না।’

‘এটা পজেটিভ হচ্ছে- কারণ তারা বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিএনপির পলিসির সঙ্গে তারা এলাইন্ড। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিএনপির মেনিফেস্টোর সঙ্গে তারা এলাইন্ড। যেহেতু তারা এলাইন্ড, সেহেতু তারা সাপোর্ট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে।’ শুক্রবার দক্ষিণ ও এশিয়াবিষয়ক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখন বাংলাদেশ-আমেরিকার ট্রেড রিলেশনশিপটা একটা ভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে যেতে পারে যে- বোথ সাইড থেকে কী ট্রেড করতে পারি। আমেরিকার সঙ্গে আমাদের সব বড় সম্পর্ক আইসিটি সেক্টরে, কারণ আমেরিকা আইসিটি সেক্টরে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। এখানে আমরা কীভাবে কো-অপারেট করতে পারি।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সালে কয়েক দফা আলোচনা শেষে পরের বছরের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে আকার ৫৫০ কোটি ডলার হয়। পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে।

খন আইএমএফ জানিয়ে দেয়, ঋণের অবশিষ্ট অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। সেই অর্থ ছাড়
করার আগে ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। অন্যদিকে অর্থনীতির বিদ্যমান বাস্তবতা, আসন্ন বাজেট, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা— এসব কারণে বাজেট-সহায়তা হিসেবে অন্তত ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশের। এবারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বৈঠকে সে বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।