‘সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বাধা শুল্কহার’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, গতকালের জাতীয় অর্থনীতিতে— এতে আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নতুন করে আবারও সামনে এসেছে। শুল্কহারের পাশাপাশি অন্য সমস্যাও রয়েছে। যেমন, বড় প্রকল্পে জমির সংকট ছাড়াও রয়েছে অধিগ্রহণে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক প্রকল্পের ধীরগতি ইত্যাদি। দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো দৈনিক গড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা সূর্যের আলো পাওয়া যায়। প্যানেল বসিয়ে প্রতি বর্গমিটারে সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোওয়াট ঘণ্টা শক্তি পাওয়া যায়, যা সৌরবিদ্যুতের জন্য আদর্শ। কিন্তু সূর্যালোকের এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতায়। উপরে বর্ণিত সমস্যা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়হীনতাও এই খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বীকার করতেই হবে, দেশে বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ টেকসই করতে সৌরবিদ্যুৎ এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ আসে সৌরশক্তি থেকে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এই হার অত্যন্ত অপ্রতুল। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে রুফটপ সোলারের মাধ্যমে আরও দেড় হাজার মেগাওয়াট যুক্ত করার পরিকল্পনাও নিয়েছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে একাধিক কাঠামোগত বাধা দূর করা জরুরি।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আমদানিনির্ভর ব্যাটারি ও যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ শুল্কহার। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও স্টোরেজ ব্যাটারি ছাড়া এই খাতের বিকাশ অসম্ভব। কিন্তু এসব পণ্যের ওপর আরোপিত উচ্চশুল্ক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে এবং প্রকল্প ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত এই খাতে শুল্ক কমানো বা কর অব্যাহতির মতো প্রণোদনা না দেয়, তা হলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বৈকি! স্থানীয়ভাবে সোলার যন্ত্রপাতি উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়াও হতে পারে টেকসই সমাধান। জমির সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি প্রয়োজন হয়, যা জনবহুল বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে পতিত জমি, চরাঞ্চল, জলাভূমির উপযোগী ভাসমান সৌর প্রকল্প এবং শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে রুফটপ সোলার প্রকল্পকে বাধ্যতামূলক বা অন্তত প্রণোদনাভিত্তিক করার মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
বিদ্যুৎ সঞ্চালন (গ্রিড) অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা সৌরশক্তির সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অনিশ্চিত, অনিয়মিত— দিনে বেশি, রাতে শূন্য। এই বৈচিত্র্য সামাল দিতে আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা (স্টোরেজ) উন্নত করা জরুরি। গ্রিড আধুনিকায়নে বিনিয়োগ না বাড়ালে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
নীতিগত স্থিরতা ও সমন্বয় না থাকাও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা, কিন্তু বারবার নীতিমালা পরিবর্তন, অনুমোদন জটিলতা নিরুৎসাহিত করে। তাই সুস্পষ্ট, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি কাঠামো জরুরি।
বর্তমানে চীনসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সৌরবিদ্যুৎকে টেকসই জ্বালানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক দেশ হিসেবে বিশাল আকারের সোলার পার্ক স্থাপন করেছে, যেখানে মরুভূমি ও অনাবাদি জমিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। মাথাপিছু হিসাবে সোলার প্যানেল স্থাপনে সবচেয়ে এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রায় ২৬ শতাংশ এসেছে বাড়ির ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেল থেকে। স্পেন ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৭৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করার পরিকল্পনা করেছে। এ লক্ষ্য পূরণে স্পেন সরকার করছাড়, সোলার প্যানেল স্থাপনে কর হ্রাসসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো স্পেনেও দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে। আমাদের দেশেও দক্ষ শ্রমিকের অভাব আছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জনশক্তি তো আছে। তাই আমরা দক্ষ শ্রমিক তৈরির উদ্যোগ নিতে পারি।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষকে রুফটপ সোলারের সুবিধা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে এবং সহজ ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা দরকার।
সত্যিই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুল্ক কমানো, জমির বিকল্প ব্যবহার, গ্রিড উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেই টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। পরিকল্পনা তো কম হলো না, বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট অঙ্গীকারই এখন জরুরি।


