আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবার সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি খাতে। জ্বালানি তেল সংকটের কারণে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। একইসঙ্গে সংকটকে পুঁজি করে ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতায় আমদানি করা কাঁচামাল সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় হতাশ ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি তেল সংকটের কারণে বন্দরে আগের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশ কমেছে। যা সামগ্রিক হারে রাজস্ব আদায়েও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ট্রাকচালক গোলাম হোসেন বলেন, আমরা সময় ও প্রয়োজনমতো জ্বালানি তেল না পাওয়ায় চরম ভোগান্তির মধ্যে আছি। ঠিকমতো মালামাল পরিবহন করতে পারছি না। ফলে একদিকে যেমন আমাদের ইনকাম হচ্ছে না তেমনি সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ভোমরা বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পথে গত কয়েক দিনে আমাকে অন্তত ৫ থেকে ৬টি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। অধিকাংশ পাম্পে তেল নেই, আবার কোথাও থাকলেও চাহিদা মতো দিচ্ছে না। ২০ থেকে ৫০ লিটার করে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কাছে কথা শুনতে হচ্ছে। আবার পথে বাড়তি খরচের কারণে আমাদের আয়েও টান পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রাক চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে।
আরেকজন ট্রাকচালক আলী নুর বলেন, তেল সংকটের কারণে আমাদের এখন দূরের ট্রিপ দিতে ভয় হয়। আগে একবার ট্যাংক ফুল করলে নিশ্চিন্তে গন্তব্যে চলে যেতাম। এখন অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর তেল ফুরিয়ে গেলে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে সময় লস হচ্ছে। গাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়াতে বলছেন। কারণ তাদের খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বাড়তি ভাড়া সহজে দিতে চায় না।
এদিকে পাম্প মালিকরা বলছেন, তেলের সরবরাহ কম। সব মিলিয়ে আমরা চালকরা মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছি। জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ট্রাকের চাকা বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না।
ভোমরা স্থলবন্দরের ট্রান্সপোর্ট আব্দুল গফুর বলেন, বন্দরে এখন আর আগের মতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ব্যবসায়ীদের কথা অনুযায়ী ট্রাক সরবরাহ করতে পারছি না। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোমরা স্থল বন্দরে সরকারের রাজস্ব খাত ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা ১০ দিন বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। দীর্ঘ ছুটির পর বন্দর সচল হলেও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট আমাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছুটির কারণে এমনিতেই অনেক মালামাল জমে ছিল, এখন ট্রাক সংকটের কারণে সেগুলো সময়মতো খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে আছি। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের দামও স্থানীয় বাজারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
ভোমরা কাস্টমস কমিশনার মুশফিকুর রহমান জানান, জ্বালানি সংকটের বিষয়টি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিদিনের রাজস্ব আহরণে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ ট্রাক আসা-যাওয়া করে, বর্তমানে তা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভোমরা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বর্তমানের এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে। আমরা আশা করছি দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং বন্দরের গতিশীলতা ফিরে আসবে।


