ড. শফি মুহাম্মদ তারেক: সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। জলজ মাছ, সামুদ্রিক লবণ, বোতলজাত পানি, দুধ, মধু, চা-পাতা, চাল, গম, ময়দা— প্রায় সব ধরনের খাদ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বাজারে পাওয়া ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিনজাতীয় ভোজ্যপণ্যে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে পরিচালিত গবেষণা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সয়াবিন তেল ও সয়াবিনভিত্তিক খাদ্যপণ্য বাংলাদেশের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহর থেকে গ্রাম, নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত— সব শ্রেণির মানুষের রান্নার প্রধান উপাদান হিসেবে সয়াবিন তেল ব্যবহৃত হয়। অতএব, এই খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানে প্রতিনিয়ত বিপুল জনগোষ্ঠীর শরীরে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণার প্রবেশ।
খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমান সময়ের এক নীরব কিন্তু গভীর পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাত্রার দ্রুত বিস্তারের ফলে মানবসভ্যতা এক অভূতপূর্ব দূষণচক্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্লাস্টিকের স্থায়িত্ব, কম খরচ, সহজপ্রাপ্যতা ও বহুমুখী ব্যবহারিক সুবিধা একে আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। কিন্তু একইসঙ্গে এ উপাদানটির ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ— যাকে আমরা মাইক্রোপ্লাস্টিক বলি— পরিবেশ, খাদ্যশৃঙ্খল ও মানবদেহে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝানো হয়, যা সরাসরি উৎপাদিত হতে পারে অথবা বৃহৎ প্লাস্টিক বস্তুর ভাঙন, ক্ষয় ও অবক্ষয়ের মাধ্যমে গঠিত হয়। এ কণাগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তাদের প্রভাব চোখে না পড়লেও গভীর ও বিস্তৃত।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎপত্তি বুঝতে গেলে আমাদের প্লাস্টিক ব্যবহারের সামগ্রিক চিত্রটি বিবেচনা করতে হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ, খাদ্য প্যাকেট, বোতল, প্লাস্টিকের ড্রাম, পাইপ, কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিক শিট, বস্ত্রশিল্পের সিন্থেটিক তন্তু— সবকিছুই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে ও সূর্যালোক, তাপ, আর্দ্রতা ও যান্ত্রিক চাপের প্রভাবে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় বিভক্ত হয়। নদী-নালা ও বৃষ্টির পানির মাধ্যমে এ কণাগুলো কৃষিজমিতে জমা হয়। আবার বায়ুর মাধ্যমে এগুলো বাতাসে ভেসে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, সংরক্ষণাগার ও খোলা খাদ্যে পৌঁছে যেতে পারে। সয়াবিন চাষের ক্ষেত্রে মাটিতে উপস্থিত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা ফসলের শিকড়ের মাধ্যমে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করে। পরে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও তেল নিষ্কাশনের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, পাইপলাইন, স্টোরেজ ট্যাংক অথবা প্যাকেজিং উপাদান থেকেও অতিরিক্ত কণা খাদ্যে সংযুক্ত হতে পারে।
ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড পণ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যান্ডেড পণ্যে শিল্পকারখানায় মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফিল্টারিং প্রযুক্তি ও উন্নত প্যাকেজিং প্রক্রিয়া থাকার কথা। অথচ তাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেলে বোঝা যায় সমস্যা কেবল উৎপাদন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কাঁচামাল, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের পুরো শৃঙ্খলজুড়েই বিস্তৃত। অন্যদিকে নন-ব্র্যান্ডেড খোলা সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে খোলা পরিবেশে সংরক্ষণ, পুনরায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক পাত্র, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ফিল্টারিংয়ের অভাব মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষণার ফলাফলগুলো সাধারণভাবে নির্দেশ করে যে, বিভিন্ন আকৃতির— ফাইবার, ফ্র্যাগমেন্ট, ফিল্ম অথবা গোলাকার কণিকা— মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যে পাওয়া যায়। এগুলোর রঙ স্বচ্ছ, নীল, লাল, কালো কিংবা সাদা হতে পারে, যা বিভিন্ন উৎসের ইঙ্গিত দেয়।
মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রবেশের প্রধান তিনটি পথ হলো খাদ্য, পানি ও বায়ু। সয়াবিন তেল রান্নায় ব্যবহৃত হওয়ায় এটি প্রতিদিনের খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রশ্ন উঠতে পারে, রান্নার সময় উচ্চতাপমাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কী হয়। কিছু ক্ষেত্রে তাপ প্লাস্টিককে আরও ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিকে ভেঙে ফেলতে পারে, যা আকারে আরও ছোট এবং জীবকোষে অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা বেশি। আবার প্লাস্টিক কণার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রাসায়নিক সংযোজক যেমন ফথালেট, বিসফেনলে, ভারী ধাতু ইত্যাদি তাপে পৃথক হয়ে খাদ্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এ রাসায়নিক পদার্থগুলো মানবদেহে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করতে, ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে ও ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করতে সক্ষম বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যদিও মানবস্বাস্থ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। তথাপি পরীক্ষাগারভিত্তিক প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে যে, উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে এবং কোষীয় পর্যায়ে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়াতে পারে। ক্ষুদ্র কণাগুলো রক্ত প্রবাহে প্রবেশ করলে এগুলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে যেতে পারে। সম্প্রতি মানবরক্ত, প্লাসেন্টা ও ফুসফুসে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার খবর বৈজ্ঞানিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সুতরাং প্রতিদিনের খাদ্য যেমন সয়াবিন তেলে এদের উপস্থিতি মোট এক্সপোজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। দেশে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনাব্যবস্থা এখনও অপর্যাপ্ত। শহরাঞ্চলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, নদীতে বর্জ্য ফেলা, খোলা ডাম্পিং, পুনর্ব্যবহারের অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্লাস্টিকের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া অব্যাহত রয়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্লাস্টিক কণা নদী ও খালে প্রবেশ করে ও সেখান থেকে কৃষিজমিতে সেচের মাধ্যমে পুনরায় স্থলে ফিরে আসে। এই চক্রাকার প্রবাহ খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। সয়াবিন চাষের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি বিদ্যমান, কারণ সেচের পানি ও মাটির গুণগতমান নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির উল্লেখযোগ্য অংশ প্লাস্টিকনির্ভর। পাইপলাইন, সঞ্চয় ট্যাংক, ফিল্টারিং ইউনিটের কিছু অংশ, বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বোতল বা পাউচ— এসব উপাদান ঘর্ষণ ও তাপের প্রভাবে ক্ষুদ্র কণা ছাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে প্লাস্টিক পাত্রের সঙ্গে খাদ্যের ক্রমাগত সংস্পর্শ কণার মাইগ্রেশন বাড়ায়। সয়াবিন তেল প্রায়ই স্বচ্ছ প্লাস্টিক বোতলে বিক্রি হয়, যা আলো ও তাপের সংস্পর্শে রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। পরিবহন ও স্টোরেজের সময় উচ্চ তাপমাত্রা বা যান্ত্রিক কম্পন এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত দিকও গুরুত্বপূর্ণ। নমুনা সংগ্রহ, ফিল্ট্রেশন, জৈবপদার্থ অপসারণ, মাইক্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণ এবং পলিমার শনাক্তকরণে স্পেকট্রোস্কোপিক প্রযুক্তির ব্যবহার— এসব ধাপের মাধ্যমে খাদ্যে উপস্থিত কণার আকার, সংখ্যা ও ধরন নির্ধারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় দূষণ এড়াতে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, কারণ পরিবেশের বাতাসেই মাইক্রোপ্লাস্টিক ভাসমান থাকতে পারে। গবেষণালব্ধ তথ্য সাধারণত প্রতি লিটার বা প্রতি কেজি খাদ্যে কণার সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়। যদিও সংখ্যাগত পরিমাণ অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, তবু ধারাবাহিক উপস্থিতিই মূল উদ্বেগের বিষয়।
দৈনিক গ্রহণযোগ্য মাত্রা নিয়ে এখনও বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মাইক্রোপ্লাস্টিকের নিরাপদ সীমা নির্ধারণে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুসারে নিয়মিত খাদ্যের মাধ্যমে বছরে হাজার থেকে লক্ষাধিক কণা মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। সয়াবিন তেল ব্যাপক ব্যবহৃত হওয়ায় এতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মোট এক্সপোজার বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও রোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণকে নিয়মিত মাননিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার অংশ করা যেতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের উচিত পণ্য অনুমোদনের আগে এবং বাজারে ছাড়ার পর নির্দিষ্ট সময় অন্তর নমুনা পরীক্ষা করা। শিল্পকারখানায় বিকল্প উপকরণ ব্যবহার, উন্নত ফিল্টারিং প্রযুক্তি, ধুলা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং প্রবর্তন প্রয়োজন। বায়োডিগ্রেডেবল বা কাচের পাত্র ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ধাতব কনটেইনারে সংরক্ষণ ইত্যাদি ব্যবস্থা মাইক্রোপ্লাস্টিক ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শুধু নীতি নয়, ভোক্তার সচেতনতাও অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত প্লাস্টিক বোতল পুনর্ব্যবহার না করা, সরাসরি রোদে প্লাস্টিক পাত্রে খাদ্য সংরক্ষণ এড়ানো, বাজারে খোলা তেলের পরিবর্তে মানসম্পন্ন প্যাকেটজাত পণ্য নির্বাচন— এসব ছোট পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে ঝুঁকি কমাতে পারে। একইসঙ্গে সামগ্রিকভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস, বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য।
মাইক্রোপ্লাস্টিক সমস্যা কেবল একটি বৈজ্ঞানিক ইস্যু নয়; এটি পরিবেশ ন্যায়বিচার, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী প্রায়ই নিম্নমানের প্যাকেজিং ও খোলা খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, ফলে তারা তুলনামূলক বেশি এক্সপোজারের ঝুঁকিতে থাকে। কৃষকরা মাটির অবক্ষয় ও ফলনের পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন, যদি মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির উর্বরতা ও মাইক্রোবায়াল ভারসাম্য প্রভাবিত করে। জলজ প্রাণিকুল ক্ষতিগ্রস্ত হলে মৎস্যসম্পদ হ্রাস পেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
টেকসই সমাধানের জন্য বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার কমাতে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, বিকল্প উপাদানের গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করা, পুনর্ব্যবহার শিল্পকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনা— এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদি ফল দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত উন্নতি প্রয়োজন, যেমন আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট ও বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রকল্প। তৃতীয়ত, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস, পরিমাণ ও প্রভাব সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
শিক্ষা ও জনসচেতনতা কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে প্লাস্টিক দূষণ ও পরিবেশ সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হলে নতুন প্রজন্ম সচেতন হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো প্রয়োজন যে, প্লাস্টিক ব্যবহারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিগত স্তরে ক্ষুদ্র পরিবর্তনও সম্মিলিতভাবে বড় প্রভাব আনতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়টি বৈশ্বিক হলেও এর প্রভাব স্থানীয়ভাবে অনুভূত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সয়াবিনজাতীয় খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ধারণা কেবল জীবাণু বা রাসায়নিক দূষণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; ক্ষুদ্র অদৃশ্য প্লাস্টিক কণাও বিবেচনার মধ্যে আনতে হবে। খাদ্যশৃঙ্খলকে সুরক্ষিত রাখতে হলে উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি ও উন্নয়ন দরকার।
মানবসভ্যতা প্লাস্টিকের সুবিধা গ্রহণ করেছে অতি দ্রুত, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ফল সম্পর্কে সচেতনতা ছিল সীমিত। এখন আমরা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে প্লাস্টিকের অবক্ষয়জাত ক্ষুদ্র কণা আমাদের শরীরের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, শিল্পক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, ভোক্তা সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যাটিকে মোকাবিলা করতে হবে। নতুবা অদৃশ্য এই দূষক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে যাবে।
সবশেষে বলা যায়, সয়াবিনজাতীয় খাদ্যদ্রব্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি কেবল একটি গবেষণালব্ধ তথ্য নয়; এটি বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের প্রতিফলন। আমাদের খাদ্যের নিরাপত্তা, পরিবেশের সুস্থতা এবং জনস্বাস্থ্যের স্থায়িত্ব একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যদি আমরা প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে শুধু সয়াবিন তেল নয়, আমাদের সমগ্র খাদ্য ব্যবস্থাকেই আরও নিরাপদ ও টেকসই করে তুলতে সক্ষম হব। অন্যথায় অদৃশ্য কণিকার এই ক্রমবর্ধমান স্রোত মানবজীবনের গভীরে প্রবেশ করে এমন সমস্যার জন্ম দেবে, যার সমাধান তখন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি ও চার্টার্ড পরিবেশবিদ, যুক্তরাজ্য
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]


