শাহেদ হারুন: ইসলামি অর্থনীতি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা কোরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে উৎসারিত। এটি একটি দৃঢ় নৈতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত যা ব্যক্তি ও সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সুশৃঙ্খল করে। যুগের পর যুগ ধরে এর নীতিমালা তাদের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে এবং সবসময় ও প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্যতা বজায় রেখেছে। বিপরীতে অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বারবার পরীক্ষার মুখে পড়ে ব্যর্থতার চক্রে আবর্তিত হয়েছে। এ লেখায় এই অনন্য ব্যবস্থার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো। আজও মালয় আর্কিপেলাগো থেকে শুরু করে সুদূর আমেরিকা পর্যন্ত ইসলামি অর্থনীতি একটি বাস্তবমুখী অর্থনীতি। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা এখনও ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উত্থাপন করতে অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছেন।
রব্বানিয়াত ও স্বাতন্ত্র্য
ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি আল্লাহ প্রদত্ত ওহির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা একে এক অনন্য রব্বানীয় বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। ফলে এটি কোনো মানবসৃষ্ট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি পুঁজিবাদের মতো সীমাহীন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, আবার সমাজতন্ত্রের মতো ব্যক্তিমালিকানাকেও অস্বীকার করে না; বরং এটি এমন একটি মধ্যপন্থা অনুসরণ করে, যা ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে আরোপিত কর আদায় করার পর বঞ্চিত শ্রেণির প্রতি নাগরিকের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। কিন্তু ইসলামি অর্থব্যবস্থায় অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে বঞ্চিত শ্রেণির প্রতি তাদের দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট বলেছেন- ‘এবং তাদের সম্পদে অধিকার রয়েছে ভিক্ষুক এবং বঞ্চিতদের।’ (সুরা আল-মা’আরিজ, আয়াত ২৪–২৫)
এই ব্যবস্থা ইসলামের সামগ্রিক আকিদা, নৈতিকতা ও শরিয়তের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে এটি একটি সমন্বিত ও আত্মসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা; যা নিজের ভেতরে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে না এবং তার লক্ষ্য থেকেও বিচ্যুত হয় না। ইসলামি অর্থনীতি এমন কিছু নীতির সমষ্টি, যা ইসলামি জীবনদৃষ্টির আলোকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে— যা সব যুগ ও পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শত বাধা সত্ত্বেও ইসলামি অর্থনীতি আজও জনপ্রিয় অর্থব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বমঞ্চে এক অসাধারণ গতিতে এগিয়ে চলেছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ইসলামি অর্থায়নের মোট সম্পদ ৫ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে; যা এই খাতের অসাধারণ অগ্রগতি ও স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ। ২০২৩ সালে হালাল খাতগুলোয় মুসলিম ভোক্তাদের মোট ব্যয় ছিল ২ দশমিক ৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার যা ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধির মূলে রয়েছে ইসলামি অর্থনীতির নৈতিক ভিত্তি। দিনার স্ট্যান্ডার্ডের ভাষায়, ‘ইসলামি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ টেকসই উন্নয়ন ও নৈতিক ভোগের মতো সর্বজনীন নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এটি বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।’
লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোতেও এখন বিস্তৃত শরিয়াসম্মত আর্থিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে; যা প্রমাণ করে ইসলামি অর্থনীতি আজ আর কেবল মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়— এটি বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।
সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন
ইসলামি অর্থনীতি সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। এটি অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। সমাজের সব সম্পদকে উৎপাদনশীল কার্যক্রমে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এটি সম্পদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আয়কে প্রকৃত শ্রম ও ঝুঁকির সঙ্গে সংযুক্ত করে।
জাকাত, ওয়াকফ ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থা— এই তিনটি মিলে একটি অনন্য বণ্টনব্যবস্থা গঠন করে যার তুলনা মানব ইতিহাসে বিরল। এর মাধ্যমে সম্পদ সুষ্ঠুভাবে প্রবাহিত হয় এবং অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আল্লাহ জনপথবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসুলের, তাঁর আত্মীয়স্বজনদের, ইয়াতিমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্য, যাতে সম্পদ তোমাদের ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।’ (সুরা আল-হাশর: ৭)
সুদ নিষিদ্ধকরণ ও সম্পদের সুরক্ষা
সুদ (রিবা) নিষিদ্ধ করা ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। বিশ্বব্যাপী বারবার সংঘটিত অর্থনৈতিক সংকট এই নিষেধাজ্ঞার প্রজ্ঞাকে প্রমাণ করেছে। সুদভিত্তিক লেনদেন মানুষের সম্পদকে শোষণ করে এবং প্রকৃত উৎপাদনের পরিবর্তে ঋণের ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম সম্পদ সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায় যেমনটি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক সংকটে দেখা গেছে।
এর বিপরীতে ইসলামি অর্থব্যবস্থা লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা ঝুঁকিকে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করে এবং বাস্তব উৎপাদনমুখী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে। ফলে ইসলামি ব্যাংকগুলো বড় অর্থনৈতিক সংকটেও তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করেছে।
সুদ নিষিদ্ধ করে নৈতিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার শরিয়াভিত্তিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ব্যাংকিং বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ইসলামি অর্থায়নের মোট সম্পদ ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ৯ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে যেখানে ইসলামি ব্যাংকিং মোট সম্পদের প্রায় ৭০ শতাংশজুড়ে রয়েছে। গত এক দশকে এই শিল্প খাত গড়ে বার্ষিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও বিস্তার লাভ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আকর্ষণের মূলে রয়েছে এর মূল্যবোধ: ‘ইসলামি ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নে— বিশেষত সংকটকালে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।’ এটি আর কোনো সীমিত পরিসরের ব্যবস্থা নয়; বরং এটি এখন নীতি, স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রবর্তক হিসেবে মূলধারার বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের দেশেও দেখা যাচ্ছে, ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থা অনেক জনপ্রিয় এবং তা ঊর্ধ্বমুখী।
ব্যক্তি মালিকানা ও সামষ্টিক মালিকানার ভারসাম্য
ইসলামি অর্থনীতি এমন একটি দ্বৈত মালিকানার ধারণা উপস্থাপন করে যেখানে ব্যক্তি মালিকানা ও সামষ্টিক মালিকানা একসঙ্গে বিদ্যমান থাকে। ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত ও সুরক্ষিত কারণ এটি মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করে এবং তাকে কাজের প্রতি উৎসাহিত করে। তবে এটি সীমাবদ্ধ— যাতে সম্পদ মজুদ, একচেটিয়া দখল বা অন্যের ক্ষতি না হয়।
অন্যদিকে সামষ্টিক মালিকানা সমাজের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করে। এই ভারসাম্যের প্রতিফলন পাওয়া যায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণীতে: ‘মুসলমানরা তিনটি বিষয়ে সমঅংশীদার: পানি, তৃণভূমি ও আগুন (জ্বালানি)।’ (সুনান আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) পানি, চারণভূমি ও জ্বালানির মতো অপরিহার্য সম্পদকে সামষ্টিক মালিকানার আওতাভুক্ত করেছেন। ফুকাহায়ে কেরাম এই হাদিসের আলোকে বলেন, সমাজের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য যে কোনো অবকাঠামো ও সম্পদ— যেমন: রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র বা সমষ্টির তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত যাতে জনকল্যাণ নিশ্চিত হয়।
নৈতিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো— এতে বস্তুগত প্রেরণা ও নৈতিক-আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটেছে। মানুষ শুধু আইনের ভয়ে নয়; বরং নৈতিক চেতনা ও ঈমানি দায়িত্ববোধ থেকে সৎ আচরণে উদ্বুদ্ধ হয়। ফলে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীল ব্যয়— সবকিছুই ইবাদতে পরিণত হয়।
ইসলামে মানুষকে সম্পদের মালিক নয়; বরং তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণা ভোগবিলাস ও অপচয়ের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা গড়ে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘অপব্যয় করো না; নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা আল-ইসরা, ২৬–২৭)
টেকসই উন্নয়ন ও সম্পদের সংরক্ষণ
আধুনিক বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও ইসলাম বহু আগেই সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অপচয় পরিহার, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ এবং পতিত জমি পুনর্জীবিত করার মতো নীতিগুলো ইসলামে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। আমরা দেখেছি নদীতে অজু করতে গেলেও নবী করিম (সা.) পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে বলেছেন- (মুসনাদ আহমদ, ইবনে মাজাহ)।
বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজের ওয়াকফ ব্যবস্থাও এর একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণে ব্যবহার করা হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করে।
ইসলামি অর্থনীতি এমন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা কেবল লাভক্ষতির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহমর্মী ও সহযোগিতামূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটগুলো যখন প্রচলিত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে তখন ইসলামি অর্থনীতি একটি নৈতিক বিকল্প হিসেবে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে; যা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক মর্যাদাও রক্ষা করতে সক্ষম।
সদস্য, গবেষণা ও অনুবাদ বিভাগ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]


