এআই: ওষুধ যখন নতুন ব্যাধি

বর্তমান বিশ্বের অনন্য উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence)। এর উদ্ভাবনের পেছনের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক। মানুষের দৈনন্দিন তথ্যের চাহিদা পূরণ, তথ্য তৈরি, গ্রহণ ও বিশ্লেষণের কাজকে সহজ ও আরামদায়ক করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এমন এক সঙ্গী হিসেবে এআইকে কল্পনা করা হয়েছিল, যাকে যেকোনো সময় পাশে পাওয়া যাবে—যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, দ্বিধাহীনভাবে ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্য থেকে সর্বোত্তম সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবে। শুরুর দিকে এআই মূলত গবেষণার কাজে সীমাবদ্ধ ছিল এবং কেবল কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি এটি ব্যবহার করতেন। পরে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে কিছু মানুষ এর ব্যবহারাধিকার পেতেন। কিন্তু ‘নলেজ ফর এভরিওয়ান’ ধারণা সামনে রেখে একসময় এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়—এক প্রকার আলাদিনের প্রদীপের মতো, যার প্রধান কাজ ছিল তথ্য সরবরাহ করা।

তবে সময় বদলেছে। মানুষের পাশাপাশি এআই-ও দ্রুত আধুনিক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে মানুষ যা করতে পারে, তার অনেক কিছুই এআই করতে সক্ষম। কৃত্রিম ছবি তৈরি, শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত, ভিডিও সম্পাদনা—এমনকি যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব সুবিধার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই-এর ব্যবহার বিশেষভাবে বেড়েছে। যে অ্যাসাইনমেন্ট করতে আগে সপ্তাহখানেক সময় লাগত, এখন তা কয়েক মুহূর্তেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। যদিও শিক্ষকরা এআই শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, তবুও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এআই-এর সহায়তায় তৈরি করা তথ্যকে মানবিক রূপ দিয়ে সহজেই তা এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে যে সময়টায় শিক্ষার্থীদের নিজেরা শিখে নিজেদের দক্ষতা যাচাই করার কথা, সেই সময় তারা অনৈতিক পন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। শুধু শিক্ষাজীবনেই নয়, এআই ভুল ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে।

কৃত্রিম ছবি ও ভিডিও তৈরিতে এআই এখন অত্যন্ত দক্ষ। NewsGuard-এর গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে প্রচারিত খবরের প্রায় ৩৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এআই দ্বারা তৈরি বা প্রভাবিত। আমাদের শেখানো হয়, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তথ্য। যে জাতি যত বেশি তথ্যসমৃদ্ধ, সে জাতি তত বেশি উন্নত। কিন্তু এআই-এর অপব্যবহার মানুষের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছে দিয়ে এই অগ্রগতিকে বারবার হুমকিতে ফেলছে। এর আকর্ষণীয় কথোপকথনের ক্ষমতায় অনেকেই এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে যে, বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে এআই-এর সঙ্গে কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। বাস্তবে এআই অনেকটা কলমের মতো। চাইলেই এটি দিয়ে জ্ঞানচর্চা করে জীবনকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়া যায়, আবার অপব্যবহার করলে নিজের প্রতিভাকেই ধ্বংস করা সম্ভব। এমনকি এটি মানুষকে এমন এক অনৈতিক পথে ঠেলে দিতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।

  • হামজা আনোয়ার
    শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়