বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি ও পণ্যবাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া সারের বড় অংশ পরিবহন করা হয়, যা এখন কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে সারের দাম ব্যাপক বেড়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে দরিদ্র দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। সেক্ষেত্রে বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও খাদ্যের বাড়তি দাম আমদানি ব্যয় বাড়াবে। প্রধান খাদ্যশস্য চালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর না হলেও গম আমদানি করতে হয়। তাই এ ক্ষেত্রে কিছুটা উদ্বেগের কারণ আছে। এর মধ্যে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ কমে এসেছে। তাই মজুদ ব্যবস্থাপনা জোরদার ও বাজার তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংক অব আমেরিকার হিসাব তুলে ধরে গত সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, যুদ্ধের কারণে কিছু সারের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। অনেক কৃষক সার ব্যবহার কমাতে বাধ্য হতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সার ব্যবহারে কাটছাঁট হলে ফসলের ফলন কমে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করবে। এর প্রভাব ধাপে ধাপে শস্য, পশুখাদ্য, এমনকি দুগ্ধ ও মাংসের বাজারেও পড়তে পারে। ইউরোপিয়ান ব্যাংক অব রি-স্ট্রাকচার অ্যান্ড ডেভেলপমন্টের (ইবিআরডি) প্রেসিডেন্ট ওডিল রেনো-বাসো সতর্ক করে বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক খাদ্যদামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তার ভাষায়, ‘এটি দামের ওপর, বিশেষ করে খাদ্যের দামের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।’
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব দেশে খাদ্য ও জ্বালানির ব্যয় ভোক্তা ব্যয়ের বড় অংশজুড়ে থাকায় মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা তুলনামূলক বেশি তীব্র হয়। ফলে সার, জ্বালানি ও খাদ্যের সম্মিলিত মূল্যস্ফীতি তাদের অর্থনীতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে। মুডিস রেটিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেরি ডিরন বলেন, অনেক উদীয়মান অর্থনীতিতে ভোক্তা মূল্যসূচকে খাদ্য ও জ্বালানির অংশ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে এসব দেশে এই খাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অনেক বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
বাংলাদেশে এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট খাদ্যশস্যের সরকারি মজুদ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ১৮৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল রয়েছে ১৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ মেট্রিক টন, গম ২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৮৬ মেট্রিক টন এবং ধান মাত্র ৬৬৪ মেট্রিক টন। এছাড়া আমদানির পথে থাকা ফ্লোটিং মজুদ হিসাবে গম রয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৮ মেট্রিক টন এবং চাল ৫৩ হাজার ২৪২ মেট্রিক টন। সব মিলিয়ে ফ্লোটিংসহ মোট মজুদ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ২১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। সেই হিসাবে বর্তমানে মজুদ কমেছে প্রায় আড়াই লাখ টনের বেশি।
মজুদের চিত্র কিছুটা ভিন্ন ইঙ্গিত দিলেও বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় চলতি মৌসুমে আমন ধানের ভালো ফলন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হয়েছে। সামনে বোরো ধানের ফলনও সন্তোষজনক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদনের চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক।
চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ধান উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৪১ লাখ মেট্রিক টন, যা আগের দুই অর্থবছরের তুলনায় বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধান উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ১৯ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪ কোটি ৬ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে গম উৎপাদন এখনও তুলনামূলক কম। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত গম উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন। এর আগের অর্থবছরে ছিল ১০ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন।
দেশের খাদ্যাভ্যাসে চালের আধিপত্য অত্যন্ত বেশি। মাথাপিছু দৈনিক চাল গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৪১৬ গ্রাম এবং বছরে গড়ে ১৫২ কেজি। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ প্রধান খাদ্য হিসেবে ভাত গ্রহণ করে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ মোটা চালের ওপর নির্ভরশীল। দেশে বছরে চালের চাহিদা ৪ কোটি টনের কম, আর উৎপাদন ৪ কোটির কিছু বেশি। ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় বড় ঘাটতির আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত মজুদের জন্য কিছু চাল আমদানি করতে হয়। পাশাপাশি বড় অংশের গম আমদানি করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে খাদ্যশস্য আমদানি ৪২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪২ লাখ টনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ টনই গম, যা মোট আমদানির ৮৪ শতাংশ। এই আমদানির বড় অংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আমদানি ব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিসংলগ্ন সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল চাপের মুখে পড়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে আমদানিকারকেরা বিকল্প ও দীর্ঘতর রুট ব্যবহারের কথা ভাবছেন, এতে পরিবহন সময় ও খরচ— উভয়ই বাড়ছে।
একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের মূল্য বাড়ায় খাদ্য পরিবহন, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপণ্যের দামে। যদিও বর্তমানে দেশে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, তবুও বাজারে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে। এতে খাদ্যশস্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই মুহূর্তে দেশে চালের তেমন কোনো সংকট নেই। উৎপাদন মৌসুম সদ্য শেষ হয়েছে এবং সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাজারে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এটি মোকাবিলা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের ওপর। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি মজুতদারি ও অতিমুনাফা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে খাদ্য নিয়ে বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব।

