জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক, গ্যাস এবং বিভিন্ন পণ্য, যা সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করে, সেগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন যেখানে একশ’টিরও বেশি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে। ফলস্বরূপ খাদ্য থেকে শুরু করে স্মার্টফোন ও ওষুধ পর্যন্ত বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর এই অবরোধ কীভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে- চলুন দেখা যাক।
খাদ্যের দামে যুদ্ধের আঁচ: সারের অভাব
পেট্রোকেমিক্যালস হলো তেল ও গ্যাস থেকে উদ্ভূত রাসায়নিক, যা উপসাগরীয় দেশগুলো বৃহৎ পরিমাণে উৎপাদন ও রপ্তানি করে। এই রাসায়নিকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সার, যা বিশ্বব্যাপী কৃষিজ উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের মোট সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ— যেমন ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া এবং ফসফেট— সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য বলছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই জলপথ দিয়ে সার-সংক্রান্ত পণ্যগুলোর চালান প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, সারের এই অভাব কৃষি উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ মার্চ এবং এপ্রিল মাস উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে বীজ বপনের প্রধান মৌসুম। এই সময়ে কৃষকরা কম সার ব্যবহার করলে বছরের শেষের দিকে ফলন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের জন্য এই জলপথ বন্ধ থাকলেও পুরো একটি ফসল উৎপাদনের মৌসুমে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যার খাদ্য নিরাপত্তার পরিণতি প্রণালীটি পুনরায় খোলার পরও দীর্ঘকাল ধরে বজায় থাকবে।’
ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ থাকলে বিশ্বব্যাপী গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল ও সবজির দাম ৫.২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। সংস্থাটির ধারণা, খাদ্যদ্রব্যের সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাম্বিয়া (৩১ শতাংশ), শ্রীলঙ্কা (১৫ শতাংশ), তাইওয়ান (১২ শতাংশ) এবং পাকিস্তান (১১ শতাংশ)। তবে বিশ্বব্যাপী সার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী রাশিয়া এই ঘাটতি পূরণে উৎপাদন বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
প্রযুক্তি ও চিকিৎসায় হিলিয়াম সংকট
বিশ্বব্যাপী হিলিয়াম গ্যাসের চালানের এক-তৃতীয়াংশ সাধারণত কাতার থেকে আসে এবং তা হরমুজ প্রণালী দিয়েই পার হয়। এটি প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের একটি উপজাত, যা সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এই ওয়েফারগুলো প্রক্রিয়াজাত করে মাইক্রোচিপ তৈরি করা হয়- যা কম্পিউটার, যানবাহন ও নিত্যনতুন গার্হস্থ্য যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত এমআরআই স্ক্যানারের চুম্বকগুলোকে ঠান্ডা রাখতেও হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কাতারের বিশাল রাস লাফান প্ল্যান্টে হিলিয়াম উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কাতার সরকার সতর্ক করেছে যে, এই ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে, যা সরবরাহের বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করেছিল যে, বিশ্বব্যাপী হিলিয়াম সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে ‘দাম বৃদ্ধি’ হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ অবরোধের ফলে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার পর্যন্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পণ্যের দাম বাড়তে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গ্লোবাল হেলথ বিষয়ক একজন সিনিয়র ফেলো প্রশান্ত যাদব সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী হিলিয়াম ঘাটতি এমআরআই মেশিনের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এমআরআই মেশিনের চুম্বক ঠান্ডা রাখতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার লিটার হিলিয়াম প্রয়োজন হয় এবং প্রতিটি স্ক্যানের সময় সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম বাষ্পীভূত হয়।
ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামালে বাধা
পেট্রোকেমিক্যালস থেকে উদ্ভূত মেথানল এবং ইথিলিনের মতো উপাদানগুলো বিশ্বব্যাপী ওষুধ- যেমন ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো: যেমন সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইন— বিশ্বের মোট পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৬ শতাংশের জন্য দায়ী। এই দেশগুলো প্রধানত হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে এসব রাসায়নিক বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি করে, যার প্রায় অর্ধেক যায় এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জেনেরিক (নন-ব্র্যান্ডেড) ওষুধ রপ্তানি করে ভারত, যার অধিকাংশই পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পাঠানো হয়। এই ভারতীয় ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাঁচামাল উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে আসে।
এছাড়াও সংঘাতের কারণে দুবাইয়ের মতো উপসাগরীয় প্রধান বিমানবন্দরগুলোর এয়ার কার্গো চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট এই বাধার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম আরও বাড়তে পারে।
সালফার: ব্যাটারি ও ধাতুর দাম বাড়ার কারণ
সালফার হলো অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের আরও একটি উপজাত এবং এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে বৃহৎ পরিমাণে রপ্তানির জন্য উৎপাদিত হয়। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে সালফার বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়। যদিও এর প্রধান ব্যবহার কৃষি সারে, তবে ধাতু প্রক্রিয়াকরণেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সালফার থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়, যা কপার, কোবাল্ট এবং নিকেলের প্রক্রিয়াকরণের জন্য এবং লিথিয়াম নিষ্কাশনের জন্য অপরিহার্য। এই ধাতুগুলো সবই ব্যাটারি উৎপাদনে প্রয়োজন, যা গার্হস্থ্য সরঞ্জাম থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক যান এবং ড্রোনের মতো সামরিক হার্ডওয়্যার পর্যন্ত সব কিছুতেই ব্যবহৃত হয়। বিশ্লেষকদের সতর্কতা, সালফারের সরবরাহ যদি এভাবে ব্যাহত হতে থাকে, তবে ব্যাটারি-নির্ভর পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
সংক্ষেপে বলা যায়, হরমুজ প্রণালী কেবল জ্বালানির এক সরু জলপথ নয়, বরং এটি খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রাণকেন্দ্র। এই জলপথের অচলাবস্থা কেবল জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর অদৃশ্যভাবে চাপ সৃষ্টি করছে, যার পরিণতি বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের ভোগ করতে হবে। সূত্র : বিবিসি

