শান্তির প্রস্তাব দিয়ে চূড়ান্ত  হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চার সপ্তাহ ধরে চলমান যুদ্ধ আরও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের আশা দেখিয়ে একদিকে শান্তি আলোচনার কথা বললেও অন্যদিকে ‘চূড়ান্ত হামলার’ প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরানে চূড়ান্ত আঘাত হানার লক্ষ্যে পেন্টাগন ১০ হাজার পর্যন্ত অতিরিক্ত স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই সম্ভাব্য অতিরিক্ত বাহিনীর মধ্যে পদাতিক সেনা ও সাঁজোয়া যান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলার পাশাপাশি স্থলবাহিনী নামানো এবং হরমুজ প্রণালির পূর্বদিকে ইরানি তেলবাহী জাহাজে অবরোধ আরোপের পরিকল্পনাও করছে।

 

এদিকে ইরানও মার্কিন স্বার্থের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ব্যাপ্তি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সংলগ্ন এলাকাগুলো অবিলম্বে খালি করার আহ্বান জানিয়েছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, মার্কিন সেনাদের ‘যেখানেই পাওয়া যাবে’, সেখানেই তাদের ওপর হামলা চালানো আইআরজিসির ‘পবিত্র দায়িত্ব’। এই আল্টিমেটামের পরই সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় সুলতান আমির ঘাঁটিতে (মার্কিন সামরিক ঘাঁটি) ভয়াবহ ড্রোন হামলা এবং বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি।

ইরানের কোম শহরে গত বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১০ জন। আবাসিক এলাকায় এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এবং তাসনিম জানিয়েছে, কোম শহরের পার্দিসান এলাকায় চালানো ওই হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। প্রথম ছয় জনের নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। পরে তা হালনাগাদ করা হয়। একই হামলায় ১০ জন আহত হয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলেও ইসরায়েলী বাহিনী ঠিকই হামলা অব্যাহত রেখেছে। তাদের হামলায় অন্ধকার নেমে এসেছে তেহরানে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা স্থগিত রাখার মেয়াদ ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়ে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তবে ইরানের একজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটিকে ‘একপেশে ও অন্যায্য’ বলে অভিহিত করে প্রকাশ্যে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবুও, বেসরকারিভাবে কিছু ইরানি কর্মকর্তা আগামী সপ্তাহে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন আলোচকদের সঙ্গে বৈঠকে বসার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এদিকে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাপ দিচ্ছেন। ইরানে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে আলোচনার জন্য রাশিয়ার আহ্বানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে শুক্রবার একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

 

হামলা জোরদার ইসরায়েলের

 

ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লেবাননের হাজির এলাকায় হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হাসান মোহাম্মদ বশিরকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের কেরমানশাহ প্রদেশ এবং দেজফুল শহরে বিভিন্ন স্থাপনায়ও হামলার দাবি করেছে, যেখানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সংরক্ষণাগার ও উৎক্ষেপণ-সংক্রান্ত স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের কোমে একটি আবাসিক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। ইরান অভিযোগ করেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১২০টি জাদুঘর, ঐতিহাসিক ভবন ও সাংস্কৃতিক স্থান সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানও পাল্টা আঘাত হানছে। আইআরজিসির মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জোলফাকারিকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তারা বৃহস্পতিবার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক জাহাজ এবং যুদ্ধবিমানের জ্বালানির ট্যাংকে হামলা চালিয়েছে।

 

ইসরায়েলি বাহিনীতে সেনা সংকট

ইরান ও লেবাননের বিরুদ্ধে একাধিক সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীতে সেনা সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠকে সতর্ক করে বলেছেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ইসরায়েলি বাহিনী ‘ভেঙে’ পড়বে। এই সংকট কাটাতে তিনি সেনা নিয়োগ আইন পরিবর্তন, প্রাক্তন সেনাদের দায়িত্বে ফেরানো এবং বাধ্যতামূলকভাবে দায়িত্বের সময়সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করেন।

 

হতাহত বাড়ছে প্রতিদিন

 

চার সপ্তাহ ধরে চলমান এই যুদ্ধে ইরানের নিহত হয়েছেন ১৯৩৭ জন এবং আহত হয়েছেন ২৪ হাজার ৮০০ জন।  লেবাননে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৬ জনে এবং আহত হয়েছে ৩ হাজার ২২৯ জন। সংঘাতের কারণে ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে ইউনিসেফ সতর্কবার্তা দিয়েছে।

 

দেশে দেশে জ্বালানি সংকট

 

এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, লাওস, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

যদিও ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা  সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে দামের যে বড় উল্লম্ফন হয়েছিল, তা পুরোপুরি হ্রাস পায়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংকটের সুযোগ নিয়ে ইরান কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু জাহাজকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার বিনিময়ে ফি নেওয়া অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অবরোধ তুলে নিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় পার করে দেওয়ার উপায় খুঁজছেন। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার উপায় নিয়ে ফ্রান্সের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ৩৫ দেশের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনা করেছেন।