শফিকুল ইসলাম শামীম: পদ্মা নদীর তীরে ভোরের আলো ফুটতেই জেগে ওঠে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক আর কাভার্ডভ্যানের শব্দে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। এই ব্যস্ততার মাঝেই এক নারীর সংগ্রামী জীবনের গল্প নীরবে বয়ে চলে। তিনি বিলকিস বেগম।
৪৫ বছর বয়সী এই নারী ৩ সন্তানের জননী। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন, সংসারের বড় দায়িত্বগুলো অনেকটাই শেষ। কিন্তু জীবনযুদ্ধ থেমে নেই।
দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীর পাড়েই তার বসবাস। শৈশব কেটেছে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে। পরিবারের অক্ষমতা আর দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোনো হয়নি তার।
শৈশবের সেই অভাবই যেন তাকে খুব দ্রুত বড় করে দেয়। যখন অন্য শিশুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন বিলকিস ভাবতে শিখেছেন কিভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায়। ক্ষুধার যন্ত্রণা তাকে ঠেলে দেয় কাজের সন্ধানে।
কিন্তু নারী হওয়ায় পথটা ছিল অনেক কঠিন। সমাজের চোখে, ভারী কাজ মানেই পুরুষের দায়িত্ব। সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেই বিলকিস বেছে নেন এক ভিন্ন পেশা। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বিকল হয়ে পড়ে থাকা ভারী যানবাহন ঠেলে তোলা বা সরানোর কাজ। এটি এমন একটি কাজ, যেখানে শক্তি, সাহস আর ধৈর্য তিনটিই প্রয়োজন।
প্রথম দিকে এই কাজ করতে গিয়ে তাকে নানা বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে। অনেকেই কটূক্তি করেছেন, কেউ কেউ অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেছেন। “নারী হয়ে এসব কাজ?” এমন প্রশ্ন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু থেমে থাকেননি বিলকিস। নিজের প্রয়োজন, পরিবারের দায় আর বাঁচার তাগিদ তাকে শক্ত করে তোলে।
ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে শুরু করেন। পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে থাকেন। কখনো বাস ঠেলা, কখনো ট্রাকের চাকা ঠিক করতে সাহায্য, আবার কখনো দুর্ঘটনায় পড়া যান সরানো। সবখানেই তার উপস্থিতি চোখে পড়ে। চালকরাও একসময় তাকে চিনে ফেলেন। প্রয়োজন হলে বিলকিসকেই ডাকেন।
এই কাজের বিনিময়ে খুব বেশি আয় হয় না। তবুও প্রতিদিনের অল্প কিছু টাকা দিয়েই চলে তার সংসার। একসময় এই টাকাতেই সন্তানদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। নিজের জীবনের সব কষ্ট ঢেলে দিয়েছেন সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে।
তবে এই পেশা যেমন কষ্টের, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও। কাজ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে তিনবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বিলকিস। কখনো চলন্ত গাড়ির ধাক্কা, কখনো ভারী যন্ত্রপাতির আঘাত। প্রতিবারই গুরুতর আহত হয়েছেন। তবুও থেমে থাকেননি। সুস্থ হয়ে আবার ফিরে এসেছেন সেই একই জায়গায়, একই কাজে, একই পেশায়।
সন্তানরা বিলকিসকে কাজে আসতে বাধা দেন। কিন্ত বিলকিস কাজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসা, তৃপ্তি ও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। যে কারণে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেন না। ভোর হতেই ছুঁটে আসেন দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে। দৌলতদিয়া ৭টি ঘাটে ঘুরে-ফিরে চলেন। আর অপেক্ষায় থাকেন কখন একটি কাজ পাবেন। কাজ না পেয়ে অনেক সময় তাকে খালি হাতেও বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আবার কখনো প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আয় করেছেন।
বিলকিস বলেন, “এই কাজ না করলে খাইতাম কী? বাঁচার জন্যই তো করতে হয়। ভয় পাই, কিন্তু পেটের দায় বড়। তিনি আরও বলেন, চুরি করি না এবং সম্মানও বিক্রি করি না। কাজ করে খাই। দীর্ঘ ৩০ বছরের এই পেশায় সম্মান নিয়ে বেঁচে আছি। এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কি হতে পারে?”
তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে শিখিয়েছে, কীভাবে কষ্টকে সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে হয়।
হাতের আঙ্গুল গুণে হিসেব করে বিলকিস বলেন, আমার বয়স এখন ৪৫ বছর। ১৫ বছর বয়সে অর্থাৎ বিয়ে হওয়া আগে থেকে ফেরি ঘাটে কাজ শুরু করি। সেই হিসেবে ৩০ বছর যাবৎ আমি ফেরি ঘাটে কাজ করি।
টানা প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সময় তো কারও জন্য থেমে থাকে না। বয়স বাড়ছে, শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না। আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেন না। ফলে আয়ও কমে গেছে। তবুও প্রতিদিন সকালে তিনি হাজির হন ফেরিঘাটে। যেন এই জায়গাটাই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের অনেকেই তাকে চেনেন ‘বিলকিস আপা’ নামে। সহকর্মীরা বলেন, বিলকিস আপা অনেক সাহসী নারী। এত বছর ধরে যে কাজ করছে, এটা সহজ না। চালকরাও তার পরিশ্রমের কথা স্বীকার করেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। এই পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য কি তিনি পাচ্ছেন? না, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নেই কোনো স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা, নেই সামাজিক নিরাপত্তা। দুর্ঘটনায় আহত হলেও নেই কোনো ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলতে হয় সবকিছু।
বিলকিসের জীবনের গল্প শুধু একজন নারীর সংগ্রামের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের এক বাস্তব চিত্র। যেখানে দারিদ্র্য মানুষকে বাধ্য করে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। যেখানে নারীরা প্রতিনিয়ত লড়াই করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। তার জীবনের প্রতিটি দিনই যেন একটি যুদ্ধ। কখনো অভাবের সঙ্গে, কখনো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে, আবার কখনো নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে।
তবুও বিলকিস থামেননি। কারণ তিনি জানেন, থেমে গেলে চলবে না। জীবনের চাকা যেমন ঘুরছে, তেমনি ঘুরতে হবে তাকেও। হয়তো সেই চলন্ত চাকার নিচেই।
এই সমাজে বিলকিসদের সংখ্যা কম নয়। তারা আলোচনায় আসেন না, শিরোনাম হন না। কিন্তু তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা নীরবে, নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য।
দৌলতদিয়ার ব্যস্ত ফেরিঘাটে যখন একের পর এক গাড়ি আসে-যায়, তখন সবার অগোচরে বিলকিসের মতো মানুষরাই সেই চলমান ব্যবস্থাকে সচল রাখেন। তাদের ঘামেই সচল থাকে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চাকা।
বিলকিস হয়তো কোনো বড় মঞ্চে পুরস্কার পাবেন না। কিন্তু তার প্রতিদিনের লড়াই, তার অদম্য সাহসতাকে একজন প্রকৃত নায়কে পরিণত করেছে। এই নীরব নায়কের গল্পই আমাদের ভাবায়, নাড়িয়ে দেয়। আর প্রশ্ন তোলে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট করছি?
—জা. অর্থনীতি/এনজে

