আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনেছে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকছে।
ইউরো নিউজ জানায়, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে। যেসব দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই, সেখানে নতুন করে এই খাতের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা এশিয়া। সংঘাত শুরু হওয়ার পর সরবরাহ বিঘ্নের ধাক্কা প্রথমে ও সবচেয়ে বেশি লাগে এই মহাদেশে, এর পর আফ্রিকায়। একইসঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপও সংকটে রয়েছে।
যেসব দেশে আগে থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, তারা স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, যেসব দেশে এ প্রযুক্তি নেই, তারা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। কেননা, একটি কেন্দ্র গড়ে তুলতে অনেক সময়, এমনকি কয়েক দশকও লেগে যায়। তবে এখন নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জ্বালানি কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাপান ২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বন্ধ করে দেওয়া পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করার কথা ভাবছে। ভূমিকম্প ও সুনামির কারণে সৃষ্ট ওই দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টরের শীতলীকরণ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তাইওয়ান বন্ধ থাকা রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে; এজন্য পরিদর্শন, নিরাপত্তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। ভিয়েতনাম সরকার রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসটমের সহায়তায় দুইটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মাণে চুক্তি করেছে। ফিলিপাইন পুরোনো একটি পারমাণবিক কেন্দ্র পুনরায় চালুর কথা ভাবছে।
অন্যদিকে আফ্রিকার কেনিয়া, রুয়ান্ডা ও দক্ষিণ আফ্রিকা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজনের (ফিশন) মাধ্যমে। এতে ইউরেনিয়ামের মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না, তবে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। তাই অনেক দেশ এখনও এ পথে হাঁটে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে ‘পারমাণবিক পুনর্জাগরণ’ ত্বরান্বিত করছে। কারণ দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বর্তমানে ৩১টি দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা বৈশ্বিক বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করে। আরও প্রায় ৪০টি দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহারের চিন্তা করছে বা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ।
আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ২০টির বেশি দেশে দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছোট আকারের মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) এখন সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। এগুলো তুলনামূলক সস্তা হলেও বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগে। কেনিয়া ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি এসএমআর চালুর পরিকল্পনা করছে।
আফ্রিকাকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়া। তাই এসব দেশ আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। রাশিয়ার রোসাটম ইতোমধ্যে মিসরের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু করেছে এবং আরও কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
আগ্রহ বাড়লেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। দুর্ঘটনা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পারমাণবিক অস্ত্রে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা এখনও বড় উদ্বেগ হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি নিরাপদ ও টেকসই সমাধান হতে পারে। এ ছাড়া সংঘাতের সময় পারমাণবিক স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলো এখন নানা বিকল্প বিবেচনা করছে—আর ইরান যুদ্ধ সেই ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। কারণ গ্যাস ও তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে—এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো সেটি এখন সরাসরি অনুভব করছে।


