- ২০ মাস অনুপস্থিত সৈয়দ রেজাউর রহমান, শেখ ফজলে নূর তাপস ও ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল
- খেলাপি-আসামি নিয়েই চলছে ব্যাংকের পর্ষদ
- নীরব বাংলাদেশ ব্যাংক
- হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলে ছুটি পাচ্ছেন তাপস
- চেয়ারম্যান নিজেও ঋণখেলাপি
- পরিচালকদের কেউ আসামি, কেউ খেলাপি
- এমডি চেয়ারম্যানের বন্ধু, চেয়ারম্যান আবার তাপসের দুলাভাই
- শেখ ফজলে নূর তাপসসহ কয়েকজন পরিচালক দীর্ঘদিন সভায় অংশ নেননি
- হোয়াটসঅ্যাপ/ই-মেইলে ছুটি নিয়ে পদ ধরে রাখছেন তাপস
- ব্যাংক খাতে সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞরা
আহমেদ ফেরদাউস খান, ঢাকা: ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী টানা তিনটি পর্ষদ সভা বা তিন মাসের বেশি সময় অনুপস্থিত থাকলে কোনো পরিচালকের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধুমতি ব্যাংকে বহাল রয়েছেন জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাই ও ভাতিজাসহ তিন পরিচালক। তারা হলেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল (ভাইস চেয়ারম্যান) ও তাদের ভাতিজা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এবং অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান (স্বতন্ত্র)। শেখ পরিবারের দুই সদস্য বিভিন্ন মামলার আসামি। এই তিন পরিচালক গত ২০ মাসে মধুমতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের টানা ১৬টি সভায় অনুপস্থিত থেকেও নিজ নিজ পদে বহাল রয়েছেন। কিন্তু ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির নিয়ম ‘ভেঙে ছুটি দিয়ে’ তাদের পরিচালক পদ টিকিয়ে রাখছেন বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। তবে এত বড় অনিয়মের মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংক রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
মধুমতি ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের সভাগুলোর ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বোর্ডের এই তিনজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ৭৯তম থেকে ৯৪তম পর্ষদ সভা পর্যন্ত টানা ১৬টি সভায় অনুপস্থিত। ২০২৪ সালের ৮ জুন পরিচালনা পর্ষদের ৭৮তম সভাই ছিল তাদের সর্বশেষ উপস্থিতি। এরপর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছর ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ৭৯তম সভায় তারা তিনজনই অনুপস্থিতি ছিলেন। এরপর থেকে গত ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত ৯৪তম পর্ষদ সভা পর্যন্ত প্রতিটি সভায় তাদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরও সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর বারবার ছুটি বাড়িয়ে তাদের পদে বহাল রাখছেন। কেবল তাই না, আরও দুজন পরিচালক টানা তিনবারের বেশি অনুপস্থিত থেকেও পদে বহাল রয়েছেন। তারা হলেন সৈয়দা শারমিন হোসেন (৮২-৯১তম সভার মধ্যে) ও মনজুরুল আহসান বুলবুল (৮১-৮৭তম সভার মধ্যে)। সার্বিকভাবে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ঋণখেলাপি এবং গুরুতর আর্থিক অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মধুমতি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদে আছেন চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, নিমাই কুমার সাহা, সালাহউদ্দিন আলমগীর, মোস্তফা কামাল, এ মান্নান খান, তানভীর আহমেদ মোস্তফা, মো. মাহবুবুর রহমান, স্বতন্ত্র পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান ও স্বতন্ত্র পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল।
ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অর্থ পাচারের মামলা রয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের কর্মী হত্যা মামলার আসামি হিসেবেও তাপসের নাম রয়েছে।
জানা গেছে, অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালক আত্মগোপনে ও বিদেশে চলে যান। তবে হোয়াটসঅ্যাপ ও ই-মেইলে ছুটি নিয়ে বিভিন্ন কৌশলে ব্যাংকের পরিচালক থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। আত্মীয়তার সম্পর্কের সূত্র ধরে শেখ পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকের পদে বহাল আছেন। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর শেখ ফজলে নূর তাপসের ভায়রা। এদিকে এমডি শফিউল আজম আবার চেয়ারম্যানের স্কুলজীবনের বন্ধু।
তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো প্রায় দুই বছর ধরে মধুমতি ব্যাংকে এত বড় এই অনিয়ম চলতে থাকলেও এ বিষয়ে নির্বিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘এ বিষয়টা আসলে ব্যাংকের কাছে জানতে হবে। কোনো পরিচালক যদি অনুপস্থিত থাকে তাকে বোর্ডের কাছ থেকে ছুটি বা অনুমতি নিতেই হবে। ব্যক্তিগত কারণে অনেকেই অনুপস্থিত থাকতে পারেন। কিন্তু সেই অনুপস্থিতি কতদিন— সেটা তো একটা সীমার মধ্যে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘করোনাকালীন ফিজিক্যালি বোর্ড মিটিং করা থেকে বিরত রেখে আমরা তখন জুম মিটিং করতাম, ভার্চুয়াল মিটিং করতাম। পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্টের পরে আমরা তো সার্কুলার দিলাম যে না, জুম মিটিং আর হবে না, সরাসরি সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে। এখন মধুমতি ব্যাংকের কাছে জানতে যেতে হবে যে আসলে তারা কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত আছে।’
খোদ মধুমতির চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীরের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হুমায়ূন কবীর একটি নামমাত্র কোম্পানির মাধ্যমে শত কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেন, যা পরিশোধ করা হয়নি। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপি কেউ ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন না। কিন্তু পরিচালক পদে থাকা কেউ ঋণখেলাপি হলে তাকে অপসারণ করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অবশ্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত হলে তিনি আবার পরিচালক হতে পারবেন। তবে কেউ ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে খেলাপি থেকে অব্যাহতির পাঁচ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত আর পরিচালক হতে পারবেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, হুমায়ূন কবীরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নর্দান হ্যাচারির অনুকূলে এনআরবিসি ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১১৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হয়ে গেছে। আর উত্তরা ফাইন্যান্সে একই প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা রয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংক গত জুলাই মাসে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৭ ধারায় নোটিশ দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিষয়টি জানিয়েছে। নর্দান হ্যাচারির পরিচালক হুমায়ূন কবীর। একই সঙ্গে ঋণের গ্যারান্টারও তিনি।
এসব বিষয়ে মধুমতি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীরকে একাধিকবার ফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তাকে মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তার কোনো জবাব দেননি।
সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে গত বছরের জানুয়ারিতে শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই মামলায় তার এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫৩৯ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এক যুগ আগে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যা-নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২১ আসামির মধ্যে শেখ ফজলে নূর তাপসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পিলখানা হত্যাকাণ্ডে তাপস ‘প্রধান সমন্বয়ক’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেন বলে অন্তবর্তী কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরিচালনা পর্ষদের সদস্য তাপস ও জুয়েল ছাড়াও শেখ পরিবারের আরও সদস্য এবং আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মধুমতি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তাপসের ভাই মধুমতি ব্যাংকের স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের। এছাড়া আছেন শেখ হাসিনার ভাগ্নে সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা রয়েছে। স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রয়েছেন গত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবেশ উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। তার বিরুদ্ধেও অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক।
আরেক পরিচালক এ মান্নান খান বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) একজন ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তিনি বিআইএফসি থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিআইএফসি থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন। এ মান্নান খান ম্যাঙ্গো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এবং মধুমতি ব্যাংকের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক।
সার্বিকভাবে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ঋণখেলাপি এবং গুরুতর আর্থিক অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘তিনটা বোর্ড মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকলে তো পদে অধিষ্ঠিত থাকার কথা না। কিন্তু তারপরও যেহেতু রয়েছে, তাই বিষয়টাকে খতিয়ে দেখা উচিত এবং নিয়ম অনুযায়ী যে ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থাই নেওয়া উচিত। বিধিসম্মত যে ব্যবস্থা, সেটা প্রতিপালন করা সুশাসনের জন্য প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুশাসনের নির্দেশনাবলি প্রতিপালন করা না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’


