প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ করবে রোবট

প্রযুক্তি ডেস্ক : রোবটকে কোনো কাজ করানোর জন্য এতদিন নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং বা ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতো। কিন্তু সেই প্রথাগত ধারণা ভেঙে দিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ ‘ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স’। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তারা এমন একটি শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা বা ‘রোবট ব্রেইন’ তৈরি করেছে, যা রোবটকে মানুষের মতো সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে কাজ করার ক্ষমতা দেবে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রোবট এমন সব কাজ করতে পারবে যা তাকে আগে কখনও শেখানো হয়নি।

সাধারণত রোবটকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ (যেমন—টেবিল পরিষ্কার করা বা কোনো বস্তু তোলা) করার জন্য হাজার হাজার বার অনুশীলন করাতে হয়। কিন্তু ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের তৈরি এই নতুন এআই মডেলটি বৃহৎ পরিসরের ডেটা সেট ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এটি অনেকটা চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো কাজ করে, তবে এর পার্থক্য হলো এটি কেবল কথা বলে না, বরং বাস্তব জগতের ভৌত কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। টেকক্রাঞ্চের তথ্য অনুযায়ী, এই রোবট মস্তিষ্কটি বিভিন্ন রোবটিক হার্ডওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে।

গবেষণাগারে দেখা গেছে, এই ‘ব্রেইন’ চালিত রোবটকে যখন কোনো একটি সম্পূর্ণ নতুন কাজ দেওয়া হয়—যেমন একটি এলোমেলো ঘর গুছিয়ে রাখা অথবা লন্ড্রি থেকে কাপড় ভাঁজ করা—সেটি কোনো পূর্ব প্রশিক্ষণ ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে। রোবটটি তার চারপাশের বস্তুগুলো পর্যবেক্ষণ করে এবং বুঝতে পারে কোন বস্তুটি কোথায় রাখা উচিত। এই সক্ষমতাকে গবেষকরা ‘জেনারালাইজড রোবটিক্স’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যা রোবটকে কেবল একটি নির্দিষ্ট কাজের গণ্ডি থেকে বের করে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী করে তুলবে।

পিটার থিয়েল, জেফ বেজোস এবং ওপেনএআই-এর মতো বড় বড় ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে এই স্টার্টআপে। টেকক্রাঞ্চ উল্লেখ করেছে, ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের এই প্রযুক্তিটি বাজারে আসার আগেই শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, এই প্রযুক্তিটি সফল হলে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে ঘরোয়া কাজেও রোবটের ব্যবহার আমূল বদলে যাবে। এর ফলে রোবট কেবল কলকারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে আটকে থাকবে না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জটিল কাজগুলোতেও অংশ নিতে পারবে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এর ‘ফিজিক্যাল ইন্টুইশন’ বা ভৌত অন্তর্দৃষ্টি। একটি ডিম কত জোরে ধরলে ভাঙবে না, অথবা একটি কাচের গ্লাস কীভাবে রাখা উচিত—এই ধরনের সাধারণ জ্ঞান যা মানুষের সহজাত, তা রোবটের মধ্যে আনা ছিল দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স দাবি করছে, তাদের মডেলটি বাস্তব জগতের লাখ লাখ ভিডিও এবং ডেটা বিশ্লেষণ করে এই সাধারণ জ্ঞান অর্জন করেছে। এর ফলে রোবট এখন পিচ্ছিল মেঝেতে কীভাবে হাঁটতে হবে বা ভারী বস্তু কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে সরাতে হবে, তা নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

যেকোনো বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মতো এটি নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি রোবট কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ শিখতে পারে, তবে তা শ্রমবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে গুদামজাতকরণ, ডেলিভারি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পেশায় নিয়োজিত কর্মীদের জায়গা রোবট দখল করে নিতে পারে। তবে ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের মতে, তাদের উদ্দেশ্য মানুষকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং মানুষের কাজের বোঝা কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো রোবটকে দিয়ে করানো।

প্রতিষ্ঠানটি এখন তাদের এই ‘রোবট ব্রেইন’ বা মস্তিষ্ককে আরও ছোট এবং আরও দক্ষ করার কাজ করছে, যাতে এটি সাধারণ বাণিজ্যিক রোবটগুলোতে সহজে যুক্ত করা যায়। তারা চায় একটি সার্বজনীন অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করতে, যা যেকোনো ধরনের রোবটকে বুদ্ধিমান করে তুলবে। টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তিটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে।

ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কেবল পর্দার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, তা বাস্তব জগতের যন্ত্রপাতির মধ্যেও প্রাণ সঞ্চার করছে। যদি রোবটগুলো সত্যিই প্রশিক্ষণ ছাড়া নতুন কাজ শিখতে পারে, তবে তা হবে বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিগত অর্জন। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কতটা বদলে দেয় এবং এর সামাজিক প্রভাবগুলো আমরা কীভাবে মোকাবিলা করি, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রোবটিক্সের এই নতুন যুগ কেবল শুরু হলো মাত্র।