হামের টিকা না দেওয়া দুই সরকারের ক্ষমাহীন অপরাধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: শিশুদের জন্য হামের টিকার ব্যবস্থা না করে বিগত দুই সরকার ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভবিষ্যতে আর কখনই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি। 

গতকাল শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। 

হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য আমি সব চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। যারা তাদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন সেসব মা-বাবা এবং স্বজনদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে এসব চিকিৎসকের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। 

তারেক রহমান বলেন, ‘এই ঘরে (ওসমানী মিলনায়তনে) যে ক’জন মানুষ আমরা উপস্থিত আছি… আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রিভিলেজড… কেউ কম কেউ বেশি। কেউ না বলতে পারবেন না কিন্তু । বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, অধিকাংশ নাগরিক কিন্তু নট প্রিভিলেজড। আসুন, যারা নট প্রিভিলেজড— আমরা অল্পসংখ্যক মানুষ যারা প্রিভিলেজড আছি চেষ্টা করি কিভাবে নট প্রিভিলেজদের কিছুটা সহযোগিতা করতে, কিছুটা সাহায্য করতে ও কিছুটা তাদের কষ্ট লাঘব করতে। আমি বিশ্বাস করি, যে কথাগুলো, যে অনুরোধগুলো আপনাদের সামনে আমি করেছি, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হব।’

সম্মেলনে উত্থাপিত মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সমস্যা পর্যায়ক্রমে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, আপনাদের সমস্যাগুলো একবারে আমাদের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না, তবে পর্যায়ক্রমিকভাবে করা হবে। 

এছাড়া মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দ্রুত সমাধান এবং তাদের গাড়ি ও চালক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনাও রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। 

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এনএইচএস-এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) এর আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা যায় কি না সেটি আমাদের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলোর দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারা দেশে ১ লাখ হেলথকেয়ার নিয়োগ দেওয়ারও একটি পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এই হেলথকেয়ারদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী সদস্য। তারা মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথকেয়ার দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো দেবেন।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া নাগরিকদের অধিকার জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের একটি দাবি। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এটি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের করুণা নয়, বরং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সুচিকিৎসা পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। 

প্রধানমন্ত্রী তার কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেকোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান।

পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু করার পরিকল্পনা বা চিন্তা-ভাবনাও করছে। যাতে করে নাগরিকরা চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আমাদের লক্ষ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আরও উন্নত করা। প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজ ও কার্যকর করা।

তারেক রহমান বলেন, নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কেও সরকার অবশ্যই ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারে সরকার সাধ্যমতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বদ্ধপরিকর।

চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমি একটি কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই, প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন।

এ সময় উপজেলা পর্যায়ের ছয়জন চিকিৎসক শোভন কুমার বসাক, মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান, সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, সুমন কান্তি সাহা এবং তাসনিম জুবায়েরকে কর্মদক্ষতার জন্য তাদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন বক্তব্য রাখেন।