ড. মতিউর রহমান : একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী দার্শনিক ধারণা আছে— যা ইতালীয় তাত্ত্বিক জর্জিও আগামবেন সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক জীবনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কয়েক দশক ধরে লেখার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন। তিনি একে ‘নগ্ন জীবন’ বা ‘বেয়ার লাইফ’ বলেছেন—যা গ্রিক দর্শনের ‘বায়োস’। অর্থাৎ সমাজ বা রাষ্ট্রে অর্থপূর্ণ ও সুরক্ষিত জীবনের বিপরীতে ‘জো’ তথা কেবল জৈবিক অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। আগামবেনের মতে, যখন কোনো মানুষ রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সুরক্ষার বাইরে থেকেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহিংসতার শিকার হয়, তখন সে এই ‘নগ্ন জীবনে’ পতিত হয়।
আগামবেন এই ধারণাটি আংশিকভাবে ‘হোমো সাসের’ নামীয় প্রাচীন রোমান আইনি চরিত্র থেকে গ্রহণ করেছিলেন। রোমান আইনে হোমো সাসের এমন এক অদ্ভুত ব্রাত্য ব্যক্তি ছিলেন, যাকে আইনগত কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই যে কেউ হত্যা করতে পারত, কিন্তু কোনো আইনি মারপ্যাঁচে তাকে ধর্মের নামে ‘বলি’ বা উৎসর্গ করা যেত না। তিনি এমন এক আইনি নো-ম্যান’স ল্যান্ডে বাস করতেন; যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন বা সামাজিক প্রথা কোনোটিই তাকে রক্ষা করত না। আগামবেনের এই কাজগুলো কেবল তাত্ত্বিকভাবে পড়াই যথেষ্ট মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণ। কিন্তু যখন এই তত্ত্বকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের ২০২৬ সালের দৈনিক খবরের পাশে রেখে মেলাতে যাওয়া হয়, তখন তা এক মর্মান্তিক সত্য হিসেবে ধরা দেয়। বাংলাদেশের রোহিঙ্গারা কোনো তাত্ত্বিক দৃষ্টান্ত নয়। তারা ১২ লাখের বেশি বাস্তব ও জীবন্ত রক্ত-মাংসের মানুষ এবং তাদের সঙ্গে যা করা হচ্ছে এবং যা হতে দেওয়া হচ্ছে— তা এই ‘নগ্ন জীবনের’ রাজনীতিরই এক চূড়ান্ত এবং সফলতম সামাজিক পরীক্ষা।
২০১৭ সালের সেই বীভৎস ও বর্বরোচিত সামরিক নিধনযজ্ঞের পর সাড়ে আট বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালেও কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো বিশ্বের বৃহত্তম এবং অন্যতম অনিরাপদ মানবিক সংকটের কেন্দ্রস্থল হিসেবে অবলীলায় টিকে রয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত শরণার্থী এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত অনুপ্রবেশকারী মিলিয়ে এক বিশাল মানবেতর জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতিকে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি পরিভাষায় বরাবরই ‘অস্থায়ী’ বা ‘সাময়িক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই অস্থায়িত্ব যখন প্রায় এক দশক ধরে কোনো বিশ্বাসযোগ্য সমাধান ছাড়াই রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখে, তখন তা আর একটি সাময়িক অবস্থা থাকে না; বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক মর্যাদায় পরিণত হয়।
এই অবস্থাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে ‘স্থায়ী অস্থায়িত্ব’। এর অর্থ হলো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘গুদামজাত’ করে রাখা হয়েছে। তাদের সেই আইনি সত্তা বা লিগ্যাল পারসোনালিটি’ থেকে সুকৌশলে বঞ্চিত করা হয়েছে; যা তাদের বৈধভাবে কাজ করতে, নিজস্ব সম্পত্তির মালিক হতে, আনুষ্ঠানিক দেশের আদালতে বিচার চাইতে বা একটি স্বীকৃত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় সন্তানদের পাঠাতে সাহায্য করত। অথচ তারা তাদের চারপাশের পরিবেশ থেকে উদ্ভূত সব ধরনের কাঠামোগত সহিংসতার নির্মম শিকার। এই অধিকারহীনতা তাদের এমন এক প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে তারা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে থেকেও রাষ্ট্রের আইনি সীমানার বাইরে অবস্থান করছে।
জর্জিও আগামবেন যখন শরণার্থী শিবির বা ক্যাম্পকে ‘আধুনিকতার প্রধান রাজনৈতিক স্থাপত্য বা বিধান’ হিসেবে উল্লেখ করেন, তখন তিনি বোঝাতে চান যে, শিবির কোনো আইনি ব্যবস্থার বিচ্যুতি বা দুর্ঘটনা নয়, বরং অধিকার এবং নাগরিকত্ব স্থগিত রাখাই শিবিরের মূল চালিকাশক্তি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় এই তত্ত্বের প্রয়োগ অত্যন্ত প্রকট এবং নিখুঁত। এখানে রোহিঙ্গারা কেবল মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অতীত সহিংসতার শিকারই নয়, বরং শিবিরের ভেতরে তারা দেশি-বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও উগ্র অপরাধী চক্রের নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হয়েছে।
যৌন সহিংসতা, অপহরণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের জোরপূর্বক সদস্য নিয়োগ এবং প্রকাশ্য দিবালোকে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি এখন শিবিরের প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে পরিণত হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী পরিবার জানিয়েছে যে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা বা যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ তাদের জন্য প্রায় শূন্যের কোটায়। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়; যা একটি মানবিক ব্যবস্থার প্রান্তে মাঝেমধ্যে ঘটে চলেছে। বরং এগুলো এমন একটি পরিকল্পিত পরিবেশ তৈরির অনুমেয় পরিণতি, যেখানে একটি জনগোষ্ঠীর আইনের আশ্রয় নেওয়ার বা রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করার কোনো অধিকার রাখা হয়নি। শরণার্থীদের জন্য কোনো কার্যকর ও দ্রুত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা ক্যাম্পের ভেতর গড়ে ওঠেনি। নিরাপত্তা বাহিনীগুলো শিবিরের ভেতরের অভ্যন্তরীণ গ্যাংস্টার কালচার ও যৌন সহিংসতাকে ঘিরে থাকা দীর্ঘদিনের ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ মোকাবিলায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এখানে অধিকারহীন করে রাখাই হলো শাসন করার প্রধান হাতিয়ার।
শিবিরগুলোর ভেতরের সংঘটিত সহিংসতা কেবল বাড়ছেই না, বরং তা এখন প্রায় ছোটখাটো গৃহযুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। জঙ্গি ও সশস্ত্র আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনগুলোর হাতে সাধারণ শরণার্থী হত্যার সংখ্যা ২০২১ সালের ২২টি থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৯০টিতে দাঁড়িয়েছিল এবং ২০২৫-২৬ সালে তা আরও ভয়াবহ ও পদ্ধতিগত আকার ধারণ করেছে। অপহরণের ঘটনা গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। শুধু ২০২৩ সালের প্রথম ৯ মাসেই ৭০০টিরও বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২১ সালে ছিল মাত্র ১০০টি।
আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)সহ অন্তত ১০টি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী বর্তমানে শিবিরগুলোর ভেতরের বিভিন্ন জোন বা ব্লকে সক্রিয়। তারা এমন এক অসহায় জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে; যাদের প্রশাসনের কাছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর জায়গা নেই। সবচেয়ে ভীতিকর এবং রহস্যময় হলো ‘আগুনের রাজনীতি’। ২০১৮ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্লাস্টিক ও বাঁশের বসতঘরগুলোয় ২ হাজার ৪২৫টি নথিভুক্ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ১ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২০ হাজারেরও বেশি আশ্রয়স্থল ছাই হয়ে গেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেও ক্যাম্প ১১-সহ বেশ কয়েকটি জায়গায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সমাজতাত্ত্বিকভাবে এগুলো কেবল নিছক দুর্ঘটনা নয়। যখন ন্যূনতম আন্তর্জাতিকমানের চেয়ে চারগুণ বেশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এক মিলিয়ন মানুষকে জাদুকরী উপায়ে অবরুদ্ধ রাখা হয় এবং যখন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ মেটাতে আগুনের বিশৃঙ্খলাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন এই ধ্বংসযজ্ঞ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
যে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কাঠামোটি এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অন্তত অনাহার থেকে রক্ষা করার কথা ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা প্রকাশ্যভাবে এবং নির্লজ্জের মতো ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের মাত্র অর্ধেক পাওয়া গিয়েছিল এবং ২০২৬ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশে। এই ‘উনিশ শতাংশ’ সংখ্যাটি কেবল একটি গাণিতিক পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঘোষণা যে, রোহিঙ্গাদের জীবন এখন আর ধনী ও দাতা দেশগুলোর অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বাধ্য হয়ে স্তরভিত্তিক রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। বর্তমানে একজন রোহিঙ্গা বেঁচে থাকার জন্য মাসে গড়ে মাত্র ১২ ডলার পায়, যা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়। কিছু পরিবার এখন এর চেয়েও কম পাবে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাবর্তন এবং তাদের চরম রক্ষণশীল বৈদেশিক সহায়তা নীতি এই সংকটকে চরমে নিয়ে গেছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, তাদের বাজেটে বিরাট ঘাটতি থাকার কারণে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২ হাজার ৮০০টি অনানুষ্ঠানিক স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এই স্কুল বন্ধের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। যখন শিক্ষা ও সুরক্ষার শেষ পরিকাঠামোটুকুও ভেঙে ফেলা হয়, তখন ওই শূন্যস্থানে খুব সহজেই অপরাধী চক্র হানা দেয় এবং শিশু পাচার ও বাল্যবিয়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। একে আমরা বলতে পারি একটি জনগোষ্ঠীর ‘পরিকল্পিত অন্তর্ধান’—যেখানে আমলাতান্ত্রিকভাবে তাদের খাদ্য ও শিক্ষা কমিয়ে দিয়ে ধীরগতির এক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যাবাসন বা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বর্তমানে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক অসততার রূপ নিয়েছে। মিয়ানমারে নিরাপদ, টেকসই বা মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ন্যূনতম পরিবেশ না থাকা সত্ত্বেও এবং সেখানকার চরম গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি জানা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রায়ই প্রত্যাবাসনের পক্ষে ফাঁপা ওকালতি অব্যাহত রেখেছে। বাস্তব সত্য হলো, মিয়ানমারে যে সামরিক জান্তা ২০১৭ সালে গণহত্যা চালিয়েছিল, তারাই এখন আরও নৃশংসরূপে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া।
২০২৫ সালের বৈশ্বিক তথ্যানুযায়ী, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের গৃহযুদ্ধের ফলে ৩৫ লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই আগুনের গোলকের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো কোনো সমাধান নয়। এটি একটি বাগাড়ম্বরপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল; যা আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে দায় এড়ানোর এবং নিজেদের ফান্ড বাঁচানোর মোক্ষম সুযোগ করে দেয়। অথচ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে ২০২৪-২৫ সালে আরও ১ লক্ষাধিক নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ শিবিরগুলো শূন্য হওয়া তো দূরের কথা, এগুলো প্রতিনিয়ত নতুন প্রাণ দিয়ে ভরে উঠছে।
জর্জিও আগামবেনের বাইরেও এই সংকটকে বুঝতে হলে আমাদের মিশেল ফুকো-এর ‘জৈব-রাজনীতি’ ধারণার দিকে তাকাতে হবে। ফুকোর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের কেবল আইনগত সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং মানুষের শরীর, জন্মহার, খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকেও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা চর্চা করে। রোহিঙ্গা শিবিরে আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থাগুলো নির্ধারণ করে দিচ্ছে একজন মানুষ কত ক্যালোরি খাবার খাবে, সে কতটুকু জায়গায় ঘুমাবে। তাদের পুরো জীবনটাই একটি বৈশ্বিক ‘জৈব-রাজনৈতিক’ ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে।
একইসঙ্গে, বিখ্যাত তাত্ত্বিক হানা আরেন্ট তার ‘দি অরিজিনস অব টোটালিটারিয়ানিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে, একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো ‘অধিকার পাওয়ার অধিকার’। যখন কোনো মানুষ নিজের রাষ্ট্র বা নাগরিকত্ব হারায়, তখন মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র তার সামনে মূল্যহীন কাগজে পরিণত হয়। রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাই হলো হানা আরেন্টের এই অধিকারহীনতার তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তারা প্রমাণ করছে যে, নাগরিকত্ব ছাড়া একজন মানুষের কোনো আন্তর্জাতিক মানবিক মূল্য আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোতে অবশিষ্ট থাকে না।
এই বিপুল ও দুঃসহ ভার একা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে বহন করা অসম্ভব এবং এর উল্টোটা ভাবা হবে এক ধরনের ঐতিহাসিক বোকামি। পৃথিবীর যেকোনো বড় রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ তার সীমিত সম্পদ দিয়ে আজ পর্যন্ত যা করেছে, তা বৈশ্বিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের আরও বেশি ভঙ্গুর করে তুলেছে। যেমন- কাজের আইনি অধিকার সম্পূর্ণ অস্বীকার করা বা শিবিরের বাইরে কোনো ধরনের উচ্চশিক্ষার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এই সিদ্ধান্তগুলো কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; এগুলো রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত, যা চাইলে মানবিক ও কৌশলগত কারণে পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব।
রোহিঙ্গাদের কেবল নিষ্ক্রিয় ‘ত্রাণগ্রহীতা’ হিসেবে খাঁচায় বন্দি না রেখে যদি তাদের নিয়ন্ত্রিত উপায়ে স্বনির্ভর হওয়ার বা ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের সুযোগ দেওয়া হতো, তবে শিবিরের ভেতরের অভ্যন্তরীণ অপরাধ ও মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসত। যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুরুতে এই বিশাল মানবিক কাঠামো তৈরি করেছিল এবং এখন তহবিল বন্ধ করে দিয়ে তা নীরবে ভেঙে ফেলছে, তাদের ওপর এই ‘নগ্ন জীবনের’ ট্র্যাজেডির দায়ভার সবচেয়ে বেশি বর্তায়।
কক্সবাজারের কাঁটাতারে ঘেরা ধূলিমলিন পথে ‘নগ্ন জীবন’ কোনো আপেক্ষিক বা দার্শনিক বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি সেই ১২ লাখ মানুষের নিষ্ঠুর ও প্রাত্যহিক বাস্তবতা, যাদের খাদ্য সরবরাহ এই সপ্তাহে আবারও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের সন্তানদের স্কুল ঘরটি চিরতরে তালাবদ্ধ এবং যারা প্রতিদিন একটি প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে বসে মিয়ানমারের আকাশ থেকে আসা বিষাক্ত ধোঁয়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
রোহিঙ্গা সংকট আজ মানবসভ্যতার এবং বিশ্ববিবেকের কাছে এক প্রকাণ্ড প্রশ্ন— আমরা কি মানুষকে কেবল জৈবিক অস্তিত্বের খাঁচায় নামিয়ে আনব, নাকি তাদের আবার মর্যাদা ও সামাজিক জীবনের অধিকার ফিরিয়ে দেব? এই সংকটের সমাধান কেবল ভূরাজনীতি বা দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে নয়, বরং মানুষের প্রাণের মূল্য ও অধিকার নির্ধারণের নতুন এক মানবিক নৈতিকতায় নিহিত।
গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]


