সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ— অথচ সবচেয়ে অবহেলিতও। টাকা হারালে ফিরে পাওয়া যায়, স্বাস্থ্য হারালে চিকিৎসা আছে; কিন্তু একটি মুহূর্ত একবার চলে গেলে তা চিরতরে শেষ। ইসলাম এই বাস্তবতাকে কোরআন ও হাদিসে এমন গভীরতায় উপস্থাপন করেছে, যা হৃদয়ে কাঁপন ধরায়।
কোরআনের শপথ: সময় নিজেই সাক্ষী
আল কোরআনে সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে আল আসর বা সময় নামের একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা আছে। ‘সময়ের শপথ— নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে; তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আল-আসর, ১০৩: ১–৩)
ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলেছেন, যদি মানুষ শুধু এই একটি সুরা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত, তাহলে তাদের জীবন পরিচালনার জন্য এটিই যথেষ্ট হতো। সময়ের শপথ করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করলেন— মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু তারাই, যারা সময়কে ঈমান, আমল ও সত্যের পথে ব্যয় করে।
দুটি নিয়ামত, অধিকাংশই গাফেল
সময়ের ব্যাপারে অধিকাংশই গাফিলতি করে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই হাদিসে আমাদের এই ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে: ‘দুটি নিয়ামত সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত— সুস্বাস্থ্য এবং অবসর।’ (সহিহ বোখারি)
নবীজি (সা.) ‘মাগবুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ ব্যবসায় ঠকে যাওয়া। যে ব্যক্তি সুস্থ ও হাতে সময় আছে, অথচ সেই সময়কে আল্লাহর পথে ব্যয় করছে না— সে আসলে সবচেয়ে বড় লোকসানে রয়েছে। অথচ সে নিজেই টের পাচ্ছে না।
‘পাঁচটি জিনিস আসার আগে পাঁচটিকে গনিমত মনে কর: বার্ধক্যের আগে তোমার যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্বাস্থ্য, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতা, ব্যস্ততার আগে অবসর এবং মৃত্যুর আগে তোমার জীবন’ (মুসতাদরাক আল-হাকিম)
এই হাদিসটি যেন জীবনের একটি পূর্ণ মানচিত্র। যৌবন চলে যাওয়ার আগে, সুস্বাস্থ্য থাকতে থাকতে, হাতে সময় থাকতে— এখনই কাজ করতে হবে। কাল করব, পরে করব— এই মানসিকতাই সময় নষ্টের মূল কারণ।
প্রতিটি দিন একটি আমানত
‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে— তার জীবনকাল সে কীভাবে নিঃশেষ করেছে।’ (সুনান আত-তিরমিজি)
জীবনকাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হবে— এটি নিছক একটি সতর্কবার্তা নয়, এটি একটি বাস্তবতা। প্রতিটি দিন আল্লাহর দেওয়া আমানত। সেই আমানত ফেসবুকে, অর্থহীন আড্ডায় বা গাফিলতে নষ্ট করলে কিয়ামতে তার হিসাব দিতে হবে।
ইসলাম সময়কে নিছক সামাজিক সুবিধার বিষয় নয়, বরং একটি পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করে। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে’ (সুরা আন-নিসা: ১০৩)। ইবাদতের একেবারে ভিত্তি থেকেই প্রমাণিত হয় যে, একজন মুসলিমকে সময় সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
নবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন— তুমি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে অহেতুক বিতর্কে জড়াবে না, তার সঙ্গে অনুচিত ঠাট্টা-মশকরা করবে না এবং কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভাঙবে না’ (তিরমিজি)। এই নির্দেশ স্পষ্ট করে যে, সময় ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা নৈতিক চরিত্রের অংশ। যে ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তার মধ্যে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, সময় জীবনের মূল উপাদান— তা নষ্ট করা মানে নিজের অস্তিত্বকেই নষ্ট করা। সুতরাং সময়ানুবর্তিতা কেবল ভদ্রতা নয়, এটি তাকওয়ার প্রকাশ।
সময়ের সদ্ব্যবহার: আমলের মাপকাঠি
‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ হলো নিরর্থক বিষয় পরিত্যাগ করা।’ (সুনান তিরমিজি)
সময়ের সদ্ব্যবহার মানে শুধু বেশি বেশি নফল পড়া নয়। যা প্রয়োজন নয়, যা উপকার করে না— তা ছেড়ে দেওয়াটাও ইসলামের সৌন্দর্য। নবীজি (সা.) এই হাদিসে আমাদের শিখিয়েছেন, সময়ের হেফাজত শুরু হয় অর্থহীন কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যমে।
সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে— প্রতিটি নিঃশ্বাসে। যে মুহূর্ত গেছে, সে আর ফিরবে না। কিন্তু যে মুহূর্ত এখনও আছে— সেটি এখনো সুযোগ। সুরা আল-আসরের ভাষায়: ঈমান, আমল, সত্য ও ধৈর্য— এই চারটি দিয়ে সময় ভরিয়ে রাখাই একমাত্র পথ ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার।
শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক


