দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং ইতোমধ্যে জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। গরমের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে রয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। আবার বিদ্যুতের চাহিদা ও জোগানে রয়েছে ভারসাম্যহীনতা। এমনকি বিদ্যুতের চাহিদার সঠিক হিসাব নেই বিতরণকারী সংস্থাগুলোর কাছে। আবার ঠিক কোন সময়টা পিক আওয়ারের (সর্বোচ্চ চাহিদা), তা নিয়েও রয়েছে জটিলতা। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদার সামঞ্জস্য হচ্ছে না।
শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অফিস-আদালতের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটছে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবীরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। অন্যদিকে কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় ফসল উৎপাদনেও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বিপিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে বিদ্যুতের সঠিক চাহিদা কত, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র কারও জানা নেই। কারণ ২০১৬ সালের পর বিদ্যুতের চাহিদার মাঠভিত্তিক জরিপ করা হয়নি। সে সময় যে চাহিদা পাওয়া গিয়েছিল, তার সঙ্গে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাড়তি ধরে চাহিদার প্রাক্কলন করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। কারণ গত এক দশকে বিতরণকারী এ সংস্থাটির বিদ্যুতের গ্রাহক তিন গুণ বেড়েছে। তবে আরইবি ২০১৬ সালের পর ৫ শতাংশ হারে বাড়তি ধরে চাহিদা হিসাব করায় বর্তমানে তাদের চাহিদা বেড়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়ে গেছে। এতে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেক বেশি হচ্ছে। লোডশেডিংও সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাচ্ছে না।
বিপিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুতের সম্ভাব্য চাহিদা এক বছর আগেই প্রাক্কলন করতে হয়। সব বিতরণকারী সংস্থার চাহিদা সমন্বিতভাবে পাঠানো হয় ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টারে (এনএলডিসি)। এজন্য সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও তার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি হিসাবও এনএলডিসিতে পাঠাতে হয়। এছাড়া প্রতিদিনই পরের দিনের বিদ্যুতের চাহিদার তথ্যও পাঠাতে হয়। সে অনুযায়ী এনএলডিসি জ্বালানি থাকা সাপেক্ষে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উৎপাদনের নির্দেশনা দেয়। উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গেই তা চাহিদা অনুযায়ী, সঞ্চালন ও বিতরণ নিশ্চিত করা হয়।
বর্তমানে বিতরণকারী সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম নেয় ডেসকো। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য এ কোম্পানির গ্রাহকরা গড়ে ১০ টাকা ৩২ পয়সা দাম দিয়ে থাকে। ডিপিডিসির গ্রাহকরা গড়ে দাম দেন প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ২১ পয়সা। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) গ্রাহকরা গড়ে বিদ্যুতের দাম দেন প্রতি ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ২১ পয়সা। নর্দান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানির (নেসকো) গ্রাহকদের কাছ থেকে গড়ে বিদ্যুতের দাম নেওয়া হয় প্রতি ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ১৯ পয়সা। সারা দেশের সব গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম পড়ে গড়ে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৯৬ পয়সা।
বর্তমান বিদ্যুতের দাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম; যার ফলে সৃষ্ট বিশাল ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে। বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের ভর্তুকির বোঝাও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। এমন কারণ দেখিয়ে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির যে প্রস্তাব বিদ্যুৎ বিভাগ দিয়েছে, তা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জরুরি হলেও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য দুর্ভোগের সৃষ্টি করবে। এমনিতেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা। তার ওপর বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হলে গ্রাহকের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারকে গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে। দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের প্রভাবে জনজীবনে যে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে; তা কমাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।


